২৩ বছর পর ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি গ্রেপ্তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১২৭ বার

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি হাফিজুর রহমানকে ২৩ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ—এমন একটি সংবাদ বগুড়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর গ্রেপ্তার আইনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে। রোববার (৭ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শাজাহানপুর উপজেলার শাকপালা এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই গ্রেপ্তার শুধু একটি মামলার অগ্রগতি নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে স্থানীয় সমাজে।

গ্রেপ্তারকৃত হাফিজুর রহমান বগুড়ার গাবতলী উপজেলার পদ্মপাড়া গ্রামের মৃত আফজাল হোসেনের ছেলে। রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–১ এর রায়ে ২০০২ সালে এক ধর্ষণ মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। বছরের পর বছর তিনি দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ব্যবহার করেছেন ছদ্মবেশ—কখনও দিনমজুর, কখনও অস্থায়ী শ্রমিক, কখনও ভিন্ন নামে ভিন্ন জায়গায় বসবাস করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়েছেন। কেউ ভাবতেও পারেনি, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পালিয়ে থাকা এই ব্যক্তি শেষমেশ ধরা পড়বেন পুলিশি নজরদারি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে।

চিলিমপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. লাল মিয়া জানান, রায়ের পর থেকেই হাফিজুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশল অবলম্বন করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি জানান, শেষ কয়েক বছর হাফিজুর পরিবার-পরিজন নিয়ে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ডোমনপুকুর গুচ্ছগ্রামে বসবাস করছিলেন। সেখানে তিনি নতুন পরিচয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে ছিলেন, যেন তিনি একেবারেই অন্য কেউ। তার এই ছদ্মবেশ এবং অবস্থান পরিবর্তনের কৌশল অনেকদিন পুলিশের হাত থেকে তাকে আড়ালে রেখেছিল।

মামলা সূত্রে জানা যায়, রংপুরের এক তরুণীকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেন হাফিজুর, যা তরুণীর পরিবার মেনে নেয়নি। তরুণীর বাবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন দণ্ড হাফিজুরকে পালিয়ে বেড়ানোর মনোভাব আরও দৃঢ় করেছিল, আর তাই তিনি কখনো আত্মসমর্পণ করেননি। কিন্তু আইনকে ফাঁকি দিয়ে সারাজীবন টিকে থাকা সম্ভব নয়—এই বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত তাকে ঘিরে ধরেছে।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতাউর রহমান বলেন, দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, গোপন অনুসন্ধান এবং প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অবশেষে হাফিজুরের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পুলিশের ভিন্ন ইউনিটের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি বলেন, “এই ধরনের দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ধরতে আমাদের নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম চলছে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

হাফিজুর দীর্ঘ বছর পর গ্রেপ্তার হলেও মামলার ভুক্তভোগী নারীর পরিবারের জন্য এ গ্রেপ্তার এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস ফেলার সুযোগ এনে দিয়েছে। এত বছর ধরে বিচার কার্যকর না হওয়ায় পরিবারটি মানসিক যন্ত্রণা বহন করছিল। গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে থাকা আত্মীয়স্বজনও বহুবার এই মামলা নিয়ে হতাশার কথা বলেছেন। অপরাধ ঘটার দুই দশক পরও যখন আসামি পলাতক থাকে, তখন ন্যায়বিচারের পথ আরও দীর্ঘ হয়—এটাই ছিল তাদের বাস্তবতা। পুলিশের সাম্প্রতিক সাফল্য সেই হতাশার পর্দা কিছুটা হলেও সরিয়েছে।

স্থানীয় মানুষজনের বক্তব্যেও উঠে এসেছে স্বস্তির সুর। তারা মনে করেন, এমন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা যখন বহু বছর পালিয়ে বেড়ায়, তখন সমাজে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। কারণ পলাতক অবস্থায় থাকা অপরাধীর সুযোগ থাকে পরিচয় গোপন করে নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার। তাই তার গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে স্থানীয়দের নিরাপত্তা বোধ আরও শক্তিশালী করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন পলাতক থাকা একজন দণ্ডিত ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেপ্তার হওয়া শুধু পুলিশের সাফল্য নয়, বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বহু বিচারপ্রার্থী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এমন সাফল্যের প্রত্যাশা করে থাকেন। এ ধরনের গ্রেপ্তার দেখায় যে—পালিয়ে থেকেও অপরাধের বিচার থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। আইন হয়তো ধীরগতি হতে পারে, কিন্তু শেষপর্যন্ত তার কাছে ধরা পড়তেই হয়।

এই ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে চলমান মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের পালিয়ে থাকার প্রবণতা। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, মামলার অগ্রগতি এবং দণ্ড কার্যকর নিশ্চিত করতে পুলিশের তথ্যভিত্তিক অভিযান বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ উচ্চ আদালতে বিচার শেষ হলেও অনেক আসামি আত্মসমর্পণ না করে আত্মগোপনে চলে যায়। যথাযথ নজরদারি না থাকলে তারা বছর পর বছর সমাজে মিশে থেকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। ফলে বিচারপ্রার্থীর জন্য ন্যায়বিচার অধরাই রয়ে যায়।

হাফিজুর রহমানের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি তাই একটি বড় বার্তা দেয়—বিচার ব্যবস্থার ধৈর্য ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির কঠোরতা অপরাধীকে শেষ পর্যন্ত আইনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েই ছাড়ে। তাকে আদালতে সোপর্দ করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিলে মামলার দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তির দিকেই এগোবে বিচারপ্রক্রিয়া।

বিচারপ্রার্থীদের জন্য আশার কথা হলো—এই ঘটনা প্রমাণ করেছে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচারের পথ থেমে থাকে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ ও পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতা অপরাধীর অবস্থান যেখানেই হোক, তাকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম। সমাজে নারীর নিরাপত্তা, বিচারপ্রার্থীর অধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধরনের সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিকভাবে, ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি হাফিজুরের গ্রেপ্তার শুধু একজন অপরাধীর ধরা পড়া নয়—এটি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ন্যায়বিচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্য মানসিক স্বস্তি এবং সমাজে নিরাপত্তাবোধের পুনরুদ্ধারের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত