প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
স্বামীকে গলাটিপে হত্যায় পরকীয়া প্রেমিকসহ স্ত্রী আটক—এই ঘটনাটি আবারও পারিবারিক বিশ্বাসভঙ্গ, পরকীয়া সম্পর্ক এবং সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতির নির্মম দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
বরগুনার বামনা উপজেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় প্রবাসফেরত এক স্বামীকে নিজ বসতঘরে গলাটিপে হত্যা করার অভিযোগে স্ত্রী ও তার পরকীয়া প্রেমিককে আটক করেছে পুলিশ। নিহত ব্যক্তি হলেন বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের ঘোপখালি গ্রামের বাসিন্দা মো. আবদুল জলিল (৪৫)। তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে কর্মরত ছিলেন এবং মাত্র ১৫ দিন আগে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর যে বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন, তা হয়তো কল্পনাও করেননি তিনি।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, মো. আবদুল জলিল প্রবাসে থাকার সময় তার স্ত্রী নাজমা বেগম (৩৫) একই এলাকার আবু খতিবের ছেলে আল আমিন (৩০)-এর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। আল আমিন দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগে এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কটি গভীর হলে বিষয়টি এলাকায়ও কানাঘুষার জন্ম দেয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রবাস থেকে দেশে ফিরে আসার পর আবদুল জলিল স্ত্রী ও গৃহকর্মীর সম্পর্কের বিষয়ে অবগত হন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসার আশঙ্কা তৈরি হলে নাজমা বেগম ও তার পরকীয়া প্রেমিক আল আমিন ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তে পৌঁছান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
রোববার দুপুরে নিজ বসতঘরে পরিকল্পিতভাবে আবদুল জলিলকে অচেতন করা হয়। এরপর গলাটিপে তাকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা পুলিশে খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং রোববার সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্ত্রী নাজমা বেগম ও আল আমিনকে থানায় নিয়ে আসে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে তারা নানা কথা বললেও একপর্যায়ে দুজনই হত্যাকাণ্ডে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সোমবার সকালে নিহত আবদুল জলিলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও হত্যার ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ ঘটনায় ঘোপখালি গ্রামে নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্কের ছায়া। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, আবদুল জলিল ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ। প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থে সংসার চালাতেন এবং পরিবারের জন্য ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। দেশে ফিরে নিজ ঘরেই এমন নির্মম পরিণতি হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। অনেকেই এই ঘটনাকে নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক বন্ধনের ভাঙনের চরম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
বামনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এ বিষয়ে বলেন, স্বামীকে গলাটিপে হত্যার ঘটনায় স্ত্রী নাজমা বেগম ও তার পরকীয়া প্রেমিক আল আমিনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এবং জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পারিবারিক কলহ, সন্দেহ ও পরকীয়া সম্পর্ক থেকে অনেক সময় ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক পরামর্শের উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দূরত্ব সম্পর্কের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি করে, যা কখনো কখনো মারাত্মক পরিণতির দিকে গড়ায়।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই পরকীয়া সম্পর্কের সামাজিক ও নৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, শুধু ব্যক্তিগত দায় নয়, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও এমন ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। সচেতন মহলের মতে, আইনগত শাস্তির পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা এবং পারস্পরিক আস্থার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরা জরুরি।