প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে আবারো মৃত ডলফিন ভেসে আসার ঘটনায় পরিবেশবিদ, স্থানীয় মানুষ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে অন্তত দুটি মৃত ডলফিন উপকূলে ভেসে আসার ঘটনা সামনে এসেছে, যা উপকূলীয় সামুদ্রিক পরিবেশের নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভেসে আসা ডলফিনগুলোর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা মৃত্যুর কারণ হিসেবে মানবসৃষ্ট কার্যকলাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রোববার সকালে উখিয়া উপজেলার মনখালী সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে একটি বড় আকৃতির মৃত ডলফিন ভেসে এসে আটকা পড়ে। সকালের দিকে সৈকতে হাঁটতে আসা মানুষ প্রথমে সেটি দেখতে পান। ডলফিনটি তখন আর জীবিত ছিল না এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, যা আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত মানুষকে বিরক্ত করে তোলে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্তও ডলফিনটি ওই স্থানেই পড়ে ছিল।
সূত্র জানায়, ভেসে আসা এই মৃত ডলফিনটি ‘ইরাবতী ডলফিন’ প্রজাতির, যার বৈজ্ঞানিক নাম অরকায়েলা ব্রেভিরোস্ট্রিস। এই প্রজাতির ডলফিন সাধারণত সমুদ্রের উপকূলীয় অঞ্চল, নদীর মোহনা ও অগভীর পানিতে বিচরণ করে। বাংলাদেশে ইরাবতী ডলফিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংরক্ষণযোগ্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর মতে, এই প্রজাতির ডলফিন বিশ্বজুড়েই হুমকির মুখে রয়েছে এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে।
এই ঘটনার কয়েকদিন আগেই, বৃহস্পতিবার ১৮ ডিসেম্বর টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীলখালী সমুদ্র সৈকতে আরেকটি মৃত ইরাবতী ডলফিন ভেসে আসার ঘটনা ঘটে। সেই ডলফিনটির শরীরেও বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দুইটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কম হওয়ায় বিষয়টি নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বরং এটি উপকূলীয় সামুদ্রিক জীবনের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরার চাপ বেড়েছে। আধুনিক ও বড় আকারের জাল ব্যবহারের কারণে অনেক সময় ডলফিনসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী অনিচ্ছাকৃতভাবে জালে আটকা পড়ে। জেলেদের একটি অংশের ধারণা, এসব ডলফিন সম্ভবত জালে জড়িয়ে গুরুতর আহত হয়ে মারা গেছে এবং পরে স্রোতের টানে উপকূলে ভেসে এসেছে। যদিও এই বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যাওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু প্রাকৃতিক মৃত্যুর ইঙ্গিত নয়, বরং মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও সামনে আনে। তাদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার কার্যক্রম, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, নৌযান চলাচলের চাপ এবং সমুদ্র দূষণ একসঙ্গে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় যেখানে ডলফিনেরা খাবারের সন্ধানে আসে, সেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব আরও বেশি পড়ে।
কক্সবাজারের উপকূল শুধু দেশের পর্যটনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নয়, এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এই এলাকায় ডলফিন, তিমি, কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। ডলফিনকে অনেক সময় সুস্থ সমুদ্র পরিবেশের সূচক হিসেবে ধরা হয়। ফলে একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এমন ঘটনা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সমুদ্রের প্রাণী বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, সচেতনতার অভাব ও যথাযথ নজরদারি না থাকার কারণেই এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। পর্যটননির্ভর এই অঞ্চলে পরিবেশের ক্ষতি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পরিবেশ ও বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে মৃত ডলফিনগুলোর ময়নাতদন্ত বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জেলেদের জাল ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে আইন প্রয়োগ জোরদারের কথাও আলোচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু তদন্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্র ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে জেলে সম্প্রদায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার পদ্ধতি উৎসাহিত করা এবং সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ বাড়ানো গেলে এমন মৃত্যুর কারণ ও ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে আবারো মৃত ডলফিন ভেসে আসার ঘটনা একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি শুধু একটি বা দুটি প্রাণীর মৃত্যুর খবর নয়, বরং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর মানুষের প্রভাব কতটা গভীর হয়ে উঠেছে, তার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।