নম্বর নয়, জীবনের মানে গড়ার সাহস—পরীক্ষায় ফেল করেও জয়ী যারা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ৭৪ বার
নম্বর নয়, জীবনের মানে গড়ার সাহস—পরীক্ষায় ফেল করেও জয়ী যারা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

একটি খারাপ পরীক্ষার ফল। হয়তো একটি ‘ফেল’। আর তাতেই যেন চারদিক থেকে ভেঙে পড়ে জীবনের কাঠামো। সমাজের চোখে তখন সে একজন ‘অযোগ্য’, আত্মীয়স্বজনের দৃষ্টিতে হতাশার প্রতীক। একাডেমিক ব্যর্থতাকে আমরা এমনভাবে দেখিয়ে দিই যেন সেটাই জীবনের শেষ কথা। শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে আমরা এখনো নম্বর দিয়ে পরিমাপ করি কার ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল। অথচ বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা—প্রচলিত পরীক্ষায় ব্যর্থ হলেও জীবনের বৃহত্তর মঞ্চে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, অসংখ্য কিংবদন্তি, পথপ্রদর্শক এবং উদ্যোক্তা এমন আছেন, যারা একসময় পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন, ভালো ফল করতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেননি, অথবা পড়াশোনায় ছিলেন একেবারেই গড়পড়তা। কিন্তু তারা থেমে যাননি। তারা এক সময় উপলব্ধি করেছিলেন—সফলতা মানে কেবল একটি সনদ নয়; বরং সেটি মানে স্বপ্ন, সাহস, চিন্তাশক্তি এবং পরিশ্রম। তাদের জীবন কেবল প্রেরণার গল্প নয়, বরং আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—জীবনের মানে নির্ধারিত হয় মনোভাব ও মানসিক দৃঢ়তার মাধ্যমে।

চীনের জ্যাক মা একসময় গণিতে পেয়েছিলেন মাত্র ১ নম্বর। তিনবার চেষ্টা করেও কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন কেএফসিতে—২৪ জন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র বাদ পড়েছিলেন তিনি। অথচ সেই জ্যাক মা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি ‘আলিবাবা’র প্রতিষ্ঠাতা। হ্যাংঝৌ নরমাল ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করা তার সংগ্রাম আজ বিশ্বজুড়ে সফলতার প্রতীক। বিনিয়োগকারীরা যখন মুখ ফিরিয়েছিলেন, তখনও নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রেখেছিলেন তিনি।

এভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের স্টিভ জবসও কলেজ শেষ করেননি। কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রতি অদম্য আগ্রহ। মাত্র ২০ বছর বয়সে বাড়ির গ্যারেজেই শুরু করেন অ্যাপলের যাত্রা। একসময় নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান থেকেই ছেঁটে ফেলা হয়েছিল তাকে। কিন্তু তিনি ফিরে এসেছিলেন, আরও দৃঢ়ভাবে। আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাকবুক দিয়ে শুধু পণ্যের বাজার নয়, বদলে দিয়েছেন বিশ্বের প্রযুক্তি ইতিহাস।

এমনই আরেক নাম বিল গেটস। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেও শেষ করতে পারেননি। কিন্তু তার ভাবনায় ছিল এক নতুন ভবিষ্যৎ, যার নাম ‘মাইক্রোসফট’। তার সাহসী সিদ্ধান্ত, সময়ের চেয়ে এগিয়ে চিন্তাভাবনা এবং নিরলস পরিশ্রম বদলে দিয়েছে মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরণ।

ভারতের ধীরুভাই আম্বানি কখনো কোনো পরীক্ষায় শীর্ষে ছিলেন না। বরং ব্যবসার স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন একেবারে সাধারণ অবস্থান থেকে। কিন্তু তার দূরদর্শিতা ও সাহসিকতা আজ রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজকে পরিণত করেছে ভারতের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীতে। তার জীবনের গল্প প্রমাণ করে, পরীক্ষার নম্বর নয়—সঠিক সময়ের সিদ্ধান্তই গড়ে তোলে ভবিষ্যৎ।

স্কুলে একাধিকবার ফেল করা উইনস্টন চার্চিলও একসময় শিক্ষকদের চোখে ‘অযোগ্য’ ছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটিই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রধান নেতা হিসেবে। তার কণ্ঠের ভাষণে উজ্জীবিত হয়েছিল একটি জাতি। শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই নয়, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেন—সফলতা বহুস্তরীয় এবং সেটি কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এদের প্রতিটি জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি পরীক্ষা জীবনের শেষ নয়। আমরা যখন পরীক্ষায় খারাপ করি বা ব্যর্থ হই, তখন যেন ভুলে যাই, একজন মানুষের সামর্থ্য ও সৃষ্টিশীলতা পরিমাপের জন্য কেবল কিছু নম্বর যথেষ্ট নয়। জীবন বহুমাত্রিক এবং এর প্রতিটি পর্বে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পরীক্ষায় ফেল করা মানেই ব্যর্থতা নয়—এটি হতে পারে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সূচনা। জীবনের বড় ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে বিশ্বাস করা, পথ চলার সাহস রাখা এবং থেমে না যাওয়া। জ্যাক মা, স্টিভ জবস, বিল গেটস কিংবা ধীরুভাই আম্বানি—তাদের গল্পগুলো আমাদের বলে দেয়, পরীক্ষার খাতায় ব্যর্থ হলেও জীবনের মঞ্চে জয়ী হওয়া সম্ভব। শর্ত একটাই—নিজেকে কখনোই ছোট মনে না করা এবং বারবার উঠে দাঁড়ানোর মানসিকতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত