ঢাকা ক্যাপিটালসের সহকারী কোচ মাহবুব আলী জাকিকে উৎসর্গ করে জয়, শোকেও অর্জিত ক্রিকেট সাফল্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯৯ বার
ঢাকা ক্যাপিটালসের সহকারী কোচ মাহবুব আলী জাকিকে উৎসর্গ করে জয়, শোকেও অর্জিত ক্রিকেট সাফল্য

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ ক্রিকেট দুনিয়ায় এক আবেগঘন দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মাঠে শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ঢাকা ক্যাপিটালসের সহকারী কোচ ও বিসিবি কোচিং স্টাফের অন্যতম সদস্য মাহবুব আলী জাকি। হঠাৎ শুরু হওয়া ওই শোকের মধ্যে ঢাকা ক্যাপিটালস তাদের বিপিএলের প্রথম ম্যাচে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেটে জয় তুলে নিয়েছে এবং এই জয়কে উৎসর্গ করেছে প্রিয় কোচের স্মৃতিতে। ঘটনার শোক ও মাঠের উত্তেজনা—দুটি অনুভূতির মিলনই ছিল আজকের দিনটি।

সকাল থেকে সিলেট স্টেডিয়ামে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে—ঢাকা ক্যাপিটালস ও রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের মধ্যে বিপিএলের দ্বিতীয় দিনের ম্যাচ মাঠে গড়ানোর ঠিক কয়েক মিনিট আগেই মহড়া অনুশীলনের সময়ই হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন মাহবুব আলী জাকি। তিনি মাঠে ওয়ার্ম-আপ সেশনের সময় গা ভর করে পড়ে যান। উপস্থিত চিকিৎসা কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR) দেন এবং দ্রুত তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আল হারামাইন হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে পারেননি এবং চিকিৎসা পরীক্ষার পরই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সে সময় প্রায় দুপুর ১টা বাজে—একটি শোকাবহ সময়, যখন দলের সবাই খেলায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

মাহবুব আলী জাকি শুধু ঢাকা ক্যাপিটালসের সহকারী কোচ ছিলেন না, বরং বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়ন ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল প্রচুর। তিনি বিসিবি’র গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের একজন অভিজ্ঞ পেস বোলিং কোচ এবং যুব ও সিনিয়র স্তরে অনেক তরুণ বোলারের দক্ষতা গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর কোচিং ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসেবে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপ জয়ে এবং বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির পারফরম্যান্স উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়েছে।

ঘটনাটি জানা মাত্রই বিপিএল মাঠে শোকের ছায়া নেমে আসে। ম্যাচ শুরুর আগে এবং ইনিংস বিরতির সময় দুই দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং ম্যাচ অফিসিয়ালরা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন—একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য মাহবুব আলী জাকির স্মৃতির প্রতি। স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে জাকির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয় এবং দর্শকেরা ব্যাপক শোক প্রকাশ করেন। বিপিএল ও বিসিবি কর্তৃপক্ষ এবং বিস্ব ক্রিকেট জগত থেকে দূর থেকে সহমর্মিতা জানানো হয় জাকির পরিবার এবং ঢাকা ক্যাপিটালস দলের প্রতি।

শোক-ছড়ানো পরিবেশেও মাঠে নেমে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে খেলা চালিয়ে যায় ঢাকা ক্যাপিটালস। টস জিতে তারা প্রথমে বোলিং বেছে নেয় এবং শুরু থেকেই ইমাদ ওয়াসিম ও নাসির হোসেনের বোলিং কার্যক্রম রাজশাহী ব্যাটিংকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে সক্ষম হয়। রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বড় কোনো জুটি গড়তে না পারায় তারা ৮ উইকেটে ১৩২ রানই করতে পারে। এরপর ঢাকার ব্যাটিং লাইন-আপ টিমকে সংগ্রহের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়—তরুণ আব্দুল্লাহ আল মামুন ৪৫ রান করে দলের সংগ্রহ গড়ছিলেন, যদিও ৪২ রানে তারা দুই উইকেট হারিয়ে বিপদে চলে গিয়েছিল। পরে সাব্বির রহমানের ২১ রানের দ্রুত ক্যামিও ইনিংস দলের জয় নিশ্চিত করে। এই জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল খেলোয়াড়দের মনে থাকা এক গভীর শোক—তবে তারা কোচের স্মৃতিতে সম্মানসহকারে খেলা শেষ করে।

ম্যাচ শেষে ঢাকা ক্যাপিটালসের অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, মাহবুব আলী জাকি তাদের কাছে শুধু সহকারী কোচই ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাবার মতো একজন গাইড, পরামর্শদাতা এবং দলের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেন, “তিনি আমাদের দলের অন্তরালে ছিলেন, এবং তার মৃত্যুবাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য একটি বিশাল ক্ষতি। আমরা সবাই ভেতরে ভেতরে খুবই ব্যথিত, কিন্তু যেহেতু আমরা মাঠে নেমেছি, তাই আমাদের কাজটুকু করতে হয়েছিল। আমরা চেষ্টা করেছি তার স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখাতে।”

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)ও জাকির প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। বিসিবি জানিয়েছে যে মাহবুব আলী জাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং তাঁর ঐতিহ্য ভবিষ্যতের প্রজন্মের কোচ ও খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা যোগাবে। উল্লেখযোগ্যভাবে দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে যেমন তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম এবং অন্যান্য তরুণ পেস বোলাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জাকির ব্যক্তিগত ও পেশাদারী অনুপ্রেরণা উল্লেখ করে শোক প্রকাশ করেছেন।

এই ধরনের ঘটনা ক্রিকেট জগতের জন্য দীর্ঘ সময় মনে রাখা হবে। বিপিএল ক্রিকেট এক উন্মাদনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উচ্ছ্বাসের লড়াই হলেও আজ সেটা শুধু খেলার মাঠের প্রতিযোগিতা নয়—এটি অনুভূতি, স্মৃতি, শ্রদ্ধা এবং জীবন ও মৃত্যুর স্মরণে একটি বড়ো ক্লাশ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। খেলোয়াড়রা, কোচিং স্টাফরা এবং দর্শকরা একজোট হয়ে ক্রিকেটের এই মঞ্চে নীরব শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন একজন কোচের প্রতি যিনি তার সময়, জ্ঞান এবং আবেগ দিয়েছেন এই খেলায়।

আজকের দিনটি রয়ে গেলো শুধু একটি জয়ের হিসাব নয়, বরং একটি মহান মানুষের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে খেলার প্রতিটি বল ও উইকেটের মধ্যে এক গভীর অনুভূতি প্রকাশ। মাঠের জয় যেমন প্রশংসিত, তেমনি কোচ মাহবুব আলী জাকির স্মৃতিতে দল ও দর্শকরা একভাবে সম্মান জ্ঞাপন করেছেন—যেন ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, জীবনের স্রোতের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক ও আবেগের প্রতিফলন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত