প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ পর্ব শেষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার জন্য নির্ধারিত ‘সিরিয়াল’ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে বিএনপির অবস্থান উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সংবাদ সম্মেলনে না বসেই ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, “বিএনপি কি পাঁচ নম্বর দল? পাঁচ নম্বরে গিয়ে কথা বলতে হবে?”
বৃহস্পতিবার ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংলাপের ১১তম দিনের বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক বিষয়গুলোতে একটি সর্বজনীন ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও নাগরিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকের পর নির্ধারিত কক্ষে সংবাদ সম্মেলন আয়োজিত হলে এক পর্যায়ে শুরু হয় বিতর্ক এবং ক্ষোভ প্রকাশ।
বৈঠক শেষে কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ সংবাদ সম্মেলনের সূচনা করেন। এরপর গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বক্তব্য দেন। ঠিক সেই সময় কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আহমদ। জোনায়েদ সাকীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন সংবাদ সম্মেলনে বসে বক্তব্য শুরু করেন। এ পর্যায়ে সালাহউদ্দিনের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি কিছুটা রূঢ় ভঙ্গিতে বলেন, “পীর সাহেবকে কেউ ডিস্টার্ব কইরেন না।” এরপর তিনি কক্ষ ত্যাগ করে গাড়িতে উঠার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান।
প্রবেশপথে সাংবাদিকেরা তাকে থামিয়ে বক্তব্যের অনুরোধ জানালে তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, “এখানে তো তোমরা সিরিয়ালই দিচ্ছ না, ছোট ছোট দল বসে পড়ে, এটা কোনো কথা? আমি চলে যাচ্ছি।” পরে আবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, “বিএনপি কি পাঁচ নম্বর দল?”
বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত সাংবাদিক ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মী সালাহউদ্দিনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তাদের অনুরোধে অবশেষে তিনি সংবাদ সম্মেলনে ফিরে এসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের পাশে বসেন। এ সময় প্রিন্স বলেন, “আমি তো ভেবেছিলাম তিনি চলে গেছেন।” উত্তরে সালাহউদ্দিন বলেন, “এটা কি ধরনের আয়োজন? বিএনপিকে পাঁচ নম্বরে বসতে হবে? এভাবে চললে সমঝোতা আসবে কিভাবে?”
সংবাদ সম্মেলনের ঠিক পরপরই জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ তার বক্তব্য শুরু করেন, যা সালাহউদ্দিনের ক্ষোভকে যেন আরও স্পষ্ট করে তোলে। যদিও ঘটনাটি পুরো সংলাপ প্রক্রিয়াকে ছায়াচ্ছন্ন করে তুলেনি, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা ও অংশগ্রহণের সমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সংলাপ ও জাতীয় ঐকমত্য গঠনের চেষ্টায় অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মর্যাদা নিশ্চিত না করা গেলে ঐকমত্য গঠন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। বিএনপির মতো একটি প্রধান দল যদি সংলাপে হেয় প্রতিপন্ন মনে করে, তবে এই প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠবে।
এই ঘটনার পর কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি, তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, ভবিষ্যতের সংলাপে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট, সমন্বিত ও সম্মানজনক সময়সূচি মেনে চলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য গঠনের জন্য আয়োজিত এই সংলাপ দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। ফলে এমন যেকোনো বিভ্রান্তি বা অসন্তোষ শুধুই ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি নয়, বরং তা বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাই অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের সমমর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে এই প্রক্রিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সফলতার পূর্বশর্ত।