প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট ও পরিবেশ দূষণের চাপে নতুন সমাধানের খোঁজে ব্যস্ত, তখন সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগানোই হয়ে উঠেছে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভরসা। উন্নত দেশগুলো বহু আগেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকলেও এখন সেই দৌড়ে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল ও আফ্রিকার দেশগুলো। সেই তালিকায় এবার আলোচনায় এসেছে উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। সূর্যের প্রাচুর্যকে পুঁজি করে দেশটি তৈরি করছে সৌরশক্তি নির্ভর খুদে বৈদ্যুতিক গাড়ি, যা শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও রাখা হয়েছে।
সূর্যের তাপশক্তিকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। সৌর প্যানেলের দক্ষতা বাড়ানো, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা উন্নত করা এবং খরচ কমানো—এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠান কতটা এগিয়ে। এতদিন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই খাতে নেতৃত্ব দিলেও, তিউনিসিয়ার মতো একটি আফ্রিকান দেশের উদ্যোগ বৈশ্বিক প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আফ্রিকায় বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার ইতোমধ্যে দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাজার গবেষণা সংস্থা মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার বৈদ্যুতিক যানবাহন বাজারের আকার দাঁড়াবে প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে, যা বর্তমান বাজার মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এই বাজারের বড় অংশ এখনও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে নবায়নযোগ্য ও জীবাশ্ম জ্বালানির মিশ্রণ ব্যবহৃত হয়। এতে পরিবেশগত সুবিধা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না। ঠিক এখানেই সৌরশক্তিনির্ভর যানবাহন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তিউনিসিয়ার প্রতিষ্ঠান বাকো মোটরস সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। আফ্রিকার অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ সূর্যালোককে কাজে লাগিয়ে তারা তৈরি করছে খুদে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও কার্গোভ্যান। এসব গাড়ির ছাদে বসানো হয়েছে উন্নতমানের সৌর প্যানেল, যা সরাসরি লিথিয়াম ব্যাটারিতে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। যদিও যানবাহনগুলো ঘরে বা রাস্তায় চার্জিং পয়েন্টে প্লাগ ইন করেও চার্জ দেওয়া যায়, তবু সৌর প্যানেলই এখানে শক্তির বড় জোগানদাতা হিসেবে কাজ করছে।
বাকো মোটরসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বোবাকার সিয়ালা জানিয়েছেন, তাদের গাড়িতে ব্যবহৃত সৌর কোষ বা সোলার সেল মোট শক্তির চাহিদার ৫০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করতে সক্ষম। তার ভাষায়, বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য তৈরি বি-ভ্যান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার চলার মতো বিদ্যুৎ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। বছরে এই হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার, যা জ্বালানি ব্যয়ের দিক থেকে বিশাল সাশ্রয় নিশ্চিত করে।
২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা বাকো মোটরস প্রথম দিকে তিন চাকার কার্গো যানবাহন তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে তারা চার চাকার গাড়ির দিকে মনোযোগ দেয়। বর্তমানে তাদের অন্যতম জনপ্রিয় মডেল বি-ভ্যান, যা ৪০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত কার্গো বহনে সক্ষম। এই গাড়ি একবার চার্জে ১০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরত্বে পণ্য পরিবহন করতে পারে। স্থানীয় বাজারে এর দাম শুরু হয়েছে ২৪ হাজার ৯৯০ তিউনিসিয়ান দিনার থেকে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকার সমান। তুলনামূলকভাবে এটি অনেক আফ্রিকান উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য হাতের নাগালে।
তবে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কেড়েছে বাকো মোটরসের দুই সিটের খুদে গাড়ি ‘বি’। ছোট আকৃতির এই গাড়িটি মূলত শহরের দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য তৈরি। একবার চার্জে এটি ৭০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে এবং সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার। শহরের ভিড়, ছোট রাস্তা ও স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে এটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর দাম শুরু হয়েছে ১৮ হাজার ২৬৪ তিউনিসিয়ান দিনার থেকে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাত লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
বাকো মোটরস এখানেই থেমে থাকতে চায় না। প্রতিষ্ঠানটির সিইও খালেদ হাবাইব জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে তৃতীয় মডেল এক্স-ভ্যানের নকশা নিয়ে কাজ করছেন। এই মডেলটি দুই যাত্রী বহনে সক্ষম হবে এবং এর কার্গো এলাকা আরও বড় করা হবে। তিনি আরও জানান, তাদের প্রতিটি গাড়ির ৪০ শতাংশের বেশি যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট ব্যাটারি ও ইস্পাত উল্লেখযোগ্য। ফলে এই শিল্প স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ববাজারে সৌর প্যানেলযুক্ত গাড়ি একেবারে নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাপটেরা মোটরসের মতো স্টার্টআপও সৌরশক্তিনির্ভর গাড়ি তৈরি করছে। তবে সেগুলোর দাম শুরুই হয় ৩০ হাজার ডলার থেকে, যা আফ্রিকার সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অধরা। বাকো মোটরস এই জায়গাটিতেই আলাদা। তারা আফ্রিকান বাজারের বাস্তবতা, মানুষের আয় ও প্রয়োজন বিবেচনা করে সাশ্রয়ী মূল্যে গাড়ি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার মতো রোদপ্রবণ অঞ্চলে সৌরশক্তিনির্ভর যানবাহনের সম্ভাবনা বিপুল। বিদ্যুৎ গ্রিডের সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং পরিবেশ দূষণের চাপ—এই তিনটি সমস্যার একসঙ্গে সমাধান দিতে পারে সৌর গাড়ি। তিউনিসিয়ার এই উদ্যোগ যদি সফল হয়, তাহলে তা শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বরং পুরো আফ্রিকার পরিবহন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সূর্যের শক্তিতে চলা এই খুদে গাড়িগুলো তাই শুধু প্রযুক্তির উদ্ভাবন নয়, বরং একটি টেকসই ভবিষ্যতের বার্তাবাহক। উন্নয়ন, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার মান—এই তিনের সেতুবন্ধন তৈরিতে তিউনিসিয়ার বাকো মোটরস আজ বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।