ডিআর কঙ্গোতে বিদ্রোহী অঞ্চলে খনি ধস, নিহত দুই শতাধিক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৪ বার
ডিআর কঙ্গোতে বিদ্রোহী অঞ্চলে খনি ধস, নিহত দুই শতাধিক

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার খনিজসমৃদ্ধ দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) আবারও মানবিক বিপর্যয়ের খবর এল। দেশটির পূর্বাঞ্চলের উত্তর কিভু প্রদেশে বিদ্রোহীদের দখলে থাকা একটি কোলটান খনিতে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্রোহীসমর্থিত কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে খনিশ্রমিক ছাড়াও শিশু ও বাজারে কাজ করা নারী রয়েছেন। হতাহতের সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত না হলেও মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

উত্তর কিভু প্রদেশের রুবায়া এলাকায় অবস্থিত এই কোলটান খনিটি গোমা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। গত বুধবার হঠাৎ করেই খনির একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। দুর্ঘটনার পর থেকে উদ্ধারকাজ চললেও দুর্গম এলাকা, নিরাপত্তাহীনতা ও বর্ষাকালের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহত ও আহতের চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যায়নি।

প্রদেশটির বিদ্রোহীসমর্থিত গভর্নরের মুখপাত্র লুমুম্বা কাম্বেরে মুইসা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ভূমিধসে ২০০ জনের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, খনির ভেতরে কাজ করা শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের বাজারে কাজ করা নারী ও শিশুরাও ধসের কবলে পড়েন। কিছু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অনেকের অবস্থা গুরুতর। অন্তত ২০ জনকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসা সুবিধা খুবই সীমিত।

মুইসা আরও বলেন, বর্তমানে উত্তর কিভুতে বর্ষাকাল চলছে। টানা বৃষ্টির কারণে মাটি নরম ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। খনির ভেতরে শ্রমিকরা কাজ করার সময়ই হঠাৎ মাটি ধসে পড়ে। এতে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ পাননি অনেকেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুহূর্তের মধ্যে খনির ভেতরে থাকা মানুষগুলো মাটিচাপা পড়ে যান। চারপাশে তখন চিৎকার আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়োজিত উত্তর কিভু প্রদেশের গভর্নর এরাস্টন বাহাতি মুসাঙ্গা শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, কিছু মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তিনি নিহত ও আহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর বক্তব্যে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেশি বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একইভাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাদেশিক গভর্নরের এক উপদেষ্টা রয়টার্সকে বলেন, নিহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। যদিও শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এএফপি স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি।

রুবায়া অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন। এই এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় খনি কার্যক্রম অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়। কোলটানসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজের জন্য অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ এসব খনিতে কাজ করতে বাধ্য হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে খনি ধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। অপরিকল্পিত খনন, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত মিলেই প্রায়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের সংঘাত, দারিদ্র্য ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির ঘাটতি। এসব কারণে খনিশ্রমিকদের জীবন সবসময়ই চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, ধসে পড়া খনিটিতে অনেক শিশু কাজ করত বলে অভিযোগ রয়েছে। দারিদ্র্য ও বিকল্প আয়ের অভাবে পরিবারগুলো শিশুদেরও খনিতে পাঠাতে বাধ্য হয়। এই দুর্ঘটনায় শিশু ও নারী হতাহত হওয়ার খবর সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। তাঁদের মতে, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও মানবিক অবহেলার ফল।

উদ্ধারকাজের সঙ্গে জড়িত এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, মাটিচাপা পড়া মানুষদের বের করে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারী যন্ত্রপাতির অভাব, বৃষ্টি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে উদ্ধারকাজ ধীরগতিতে চলছে। অনেক ক্ষেত্রে হাতেই মাটি খুঁড়ে মরদেহ বের করতে হচ্ছে। ফলে সময় যত যাচ্ছে, জীবিত উদ্ধারের আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

ডিআর কঙ্গোর সরকারিভাবে এই দুর্ঘটনা নিয়ে এখনো বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবিক সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে খনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, শিশু শ্রম বন্ধ এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় খনি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, বিশ্বের প্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের পেছনে লুকিয়ে আছে কত মানুষের রক্ত ও কান্না। উন্নত বিশ্বের চাহিদা মেটাতে গিয়ে দরিদ্র অঞ্চলের মানুষ কীভাবে জীবন বাজি রেখে কাজ করছে, রুবায়ার এই খনি ধস তারই করুণ উদাহরণ। দুই শতাধিক প্রাণহানির এই ঘটনায় ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য এটি অপূরণীয় ক্ষতি, আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে। একই সঙ্গে খনিজসমৃদ্ধ কিন্তু সংঘাতপীড়িত অঞ্চলগুলোতে মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com