প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা কাজে স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও। বিশেষ করে ব্যবহারকারীর অবস্থান বা লোকেশন তথ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক ও শঙ্কা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আইফোন ও আইপ্যাড ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা জোরদারে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। ‘লিমিট প্রিসাইস লোকেশন’ নামের এই নতুন নিরাপত্তা সুবিধা চালুর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তথ্য সংগ্রহ করা আরও কঠিন করে তুলছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যাপলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন এই সুবিধা চালু থাকলে মোবাইল অপারেটররা আর ব্যবহারকারীদের নিখুঁত লোকেশন তথ্য জানতে পারবে না। অর্থাৎ আইফোন বা সেলুলার সুবিধাযুক্ত আইপ্যাড ব্যবহারকারীরা কোথায় আছেন, সেই সুনির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং তাঁদের আশপাশের এলাকার একটি আনুমানিক অবস্থানই অপারেটরদের কাছে পৌঁছাবে। এর ফলে সাইবার অপরাধী, অবৈধ নজরদারি কার্যক্রম কিংবা তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে দাবি অ্যাপলের।
বর্তমানে স্মার্টফোনের লোকেশন তথ্য শুধু বিভিন্ন অ্যাপই নয়, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররাও সংগ্রহ করে থাকে। অনেক সময় ব্যবহারকারীরা না জানলেও নেটওয়ার্ক পর্যায়ে তাঁদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান হয়। এই তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিপণন প্রতিষ্ঠান কিংবা কখনো কখনো অসাধু চক্রের হাতেও পৌঁছাতে পারে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। ‘লিমিট প্রিসাইস লোকেশন’ সুবিধা চালুর মাধ্যমে অ্যাপল মূলত এই নেটওয়ার্ক-স্তরের লোকেশন শেয়ারিংকেই সীমিত করছে।
অ্যাপলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন এই সেটিং চালু থাকলে আইফোন বা আইপ্যাড থেকে মোবাইল অপারেটরের কাছে পাঠানো লোকেশন তথ্য আগের মতো সুনির্দিষ্ট থাকবে না। ব্যবহারকারীরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন বা বসে আছেন, সেই নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত না হয়ে কয়েকশ মিটার বা তারও বেশি পরিসরের একটি আনুমানিক এলাকা দেখাবে। এতে করে অপারেটররা ব্যবহারকারীর চলাচলের নিখুঁত গতিপথ বা নির্দিষ্ট অবস্থান ট্র্যাক করতে পারবে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সীমাবদ্ধতা শুধু মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ব্যবহারকারীরা যদি কোনো অ্যাপকে সুনির্দিষ্ট লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি দেন, তাহলে সেই অ্যাপ আগের মতোই নির্ভুল অবস্থান তথ্য পাবে। একইভাবে জরুরি পরিস্থিতিতে ফার্স্ট রেসপন্ডার বা জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সঠিক লোকেশন তথ্য শেয়ার করার ব্যবস্থাও অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না বলে আশ্বস্ত করেছে অ্যাপল।
বর্তমানে ‘লিমিট প্রিসাইস লোকেশন’ সুবিধাটি আইওএস ২৬.৩ অপারেটিং সিস্টেমে চলা নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইসে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আইফোন এয়ার, আইফোন ১৬ই এবং আইপ্যাড প্রো (এম৫)–এর ওয়াই-ফাই ও সেলুলার সংস্করণ। প্রাথমিকভাবে এই সুবিধা সব দেশে বা সব অপারেটরের নেটওয়ার্কে চালু হয়নি। জার্মানির টেলিকম, থাইল্যান্ডের এআইএস ও ট্রু, যুক্তরাজ্যের ইই ও বিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বুস্ট মোবাইলসহ কয়েকটি নির্বাচিত অপারেটরের নেটওয়ার্কে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হয়েছে।
অ্যাপল আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সুবিধা চালুর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেনি। তবে প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল নজরদারি, তথ্য ফাঁস এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে থাকায় অ্যাপল আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দিতে চাইছে। অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদেরকে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার রক্ষাকবচ হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে, আর এই নতুন উদ্যোগ সেই অবস্থানকেই আরও শক্তিশালী করছে।
মোবাইল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সিটিজেন ল্যাবের গবেষক গ্যারি মিলার এ বিষয়ে বলেন, সাধারণত মোবাইল অপারেটররা সেল টাওয়ারের মাধ্যমে কোনো ফোনের আনুমানিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থান আরও নির্ভুল করতে ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোনই নেটওয়ার্কের কাছে অতিরিক্ত তথ্য পাঠায়। বেশির ভাগ ব্যবহারকারীই জানেন না যে, অ্যাপ ব্যবহারের বাইরে গিয়েও তাঁদের ডিভাইস থেকে এ ধরনের লোকেশন তথ্য শেয়ার হতে থাকে। অ্যাপ পর্যায়ে জিপিএসের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এত দিন পর্যন্ত নেটওয়ার্ক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট লোকেশন শেয়ার পুরোপুরি সীমিত করার কার্যকর কোনো উপায় ছিল না।
এই দিক থেকে ‘লিমিট প্রিসাইস লোকেশন’ একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এটি এখনো অল্প কয়েকটি অপারেটরের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবুও ভবিষ্যতে আরও বেশি নেটওয়ার্ক ও দেশে এই সুবিধা চালু হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি তা হয়, তাহলে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু ব্যবহারকারীদের জন্য নয়, বরং পুরো প্রযুক্তি খাতের জন্যও একটি বার্তা। অন্য স্মার্টফোন নির্মাতা ও অপারেটরদের ওপরও চাপ তৈরি হবে, যেন তারাও ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। বিশেষ করে যেসব দেশে ডিজিটাল নজরদারি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, সেখানে এই ধরনের প্রযুক্তিগত সমাধান নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘লিমিট প্রিসাইস লোকেশন’ চালুর মাধ্যমে অ্যাপল আবারও দেখাল যে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা তাদের অগ্রাধিকারের শীর্ষে। যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও স্মার্টফোন ব্যবহারের ভবিষ্যতে লোকেশন গোপনীয়তার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।