যুদ্ধবিরতির ছায়ায় গাজায় রক্তক্ষয়ী বিমান হামলা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৬ বার

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নতুন করে রক্তক্ষয়ী বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত এসব হামলায় অন্তত ৩৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী শিশু এবং একই পরিবারের সাত সদস্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।

শনিবার একাধিক সূত্রের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলি যুদ্ধবিমান গাজা সিটি খান ইউনিস ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক স্থাপনা আবাসিক ভবন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানবিক বিপর্যয়ের মুখে থাকা গাজার সাধারণ মানুষ আবারও আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগ জানায়, শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া হামলাগুলোতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সংকটের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চিকিৎসা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পশ্চিম গাজা সিটির রিমাল এলাকায় একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে চালানো ইসরাইলি বিমান হামলায় তিন শিশু ও দুই নারীসহ পাঁচজন নিহত হন। ওই ভবনে বসবাসকারী পরিবারগুলো ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় হামলার শিকার হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন আরও কয়েকজন।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের উত্তর পশ্চিম অংশের আসদা এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য স্থাপিত একটি তাঁবুতে চালানো হামলায় একই পরিবারের সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন এক ব্যক্তি তার তিন ছেলে এবং তিন নাতি নাতনি। খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের প্যারামেডিকরা হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই পরিবারটি সম্প্রতি অন্য এলাকা থেকে পালিয়ে এসে তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিল।

এছাড়া পূর্ব গাজা সিটির আল তুফাহ এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে চালানো হামলায় বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ওই এলাকায় ইতোমধ্যেই বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন। নতুন করে হামলার ফলে সেখানকার মানুষ আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়েছেন।

ইসরাইলি যুদ্ধবিমান গাজা সিটির উত্তর পশ্চিমের আল জাল্লা সড়ক এবং মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাংশে পৃথক দুটি হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কয়েকটি স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। শরণার্থী শিবির এলাকায় হামলার খবরে সেখানে বসবাসরত মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে খান ইউনিসের আল মাওয়াসি এলাকায় স্ট্রিট ২ এ অবস্থিত আল রিবাত কলেজসংলগ্ন গাইথ শিবিরের প্রশাসনিক ভবনেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এই শিবিরে শত শত বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদক জানিয়েছেন। হামলার ফলে শিবিরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু পরিবার আবারও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলার আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ওই এলাকা খালি করার সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তবে বাস্তবে সেই সতর্কতার পরপরই একটি ইসরাইলি ড্রোন থেকে প্রাথমিক হামলা চালানো হয়। ফলে অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পাননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির মধ্যে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধবিরতির চেতনার সরাসরি লঙ্ঘন।

গাজায় চলমান এই হামলা নতুন করে মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা আগেই সতর্ক করেছিল, গাজায় খাদ্য পানি ও চিকিৎসা সেবার ঘাটতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নতুন করে বিমান হামলায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচার পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো যুদ্ধবিরতি থাকা অবস্থায় বেসামরিক এলাকায় হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, নারী শিশু এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ইসরাইল ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে শান্তি উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এসব হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এ ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গাজায় মানবিক বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ এ পৌঁছানো বিশ্ববাসীর সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। শান্তির প্রত্যাশায় থাকা গাজার সাধারণ মানুষ আবারও আতঙ্ক আর শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কত দ্রুত শান্তির পথে ফিরবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com