প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এমন একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা সাধারণ মানুষের ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। নাসার নতুন সুপারকম্পিউটার ‘অ্যাথেনা’ এমন ক্ষমতাসম্পন্ন যে, সাধারণ কম্পিউটার যা সম্পন্ন করতে ৫০০ বছর সময় নেবে, অ্যাথেনা তা মাত্র এক দিনের মধ্যে শেষ করতে সক্ষম। এই কম্পিউটার কেবল দ্রুত নয়, বরং সাশ্রয়ীও বটে, যা মহাকাশ গবেষণা, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু গবেষণা ও অ্যারোনটিকস সহ বিভিন্ন জটিল গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হবে।
এই বছরের জানুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার এইমস রিসার্চ সেন্টারে স্থাপিত অ্যাথেনা দেখতে সাধারণ কম্পিউটারের মতো হলেও এর ক্ষমতা চমকপ্রদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাথেনার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ২০ পেটাফ্লপসের বেশি, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে এক কোয়াড্রিলিয়ন গণনা করে এটি বিশাল ডেটাসেটের বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। প্রতি সেকেন্ডে এটি ২০ বার এই কাজ করে, ফলে নাসার পুরোনো প্লাইয়াদিস বা এইটকেন সিস্টেমের তুলনায় এটি বহুগুণ দ্রুত।
নাসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অ্যাথেনা কেবল ক্ষমতাসম্পন্নই নয়, এটি মডুলার ডিজাইনে তৈরি হওয়ায় অত্যন্ত নমনীয়। পুরো ভবন ভেঙে না দিয়ে এর কুলিং সিস্টেম বা হার্ডওয়্যার পরিবর্তন করা যায়, যা খরচ কমায় এবং গবেষণার কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না। বিদ্যুৎ খরচও কমানো হয়েছে নতুন বাতাস চলাচলের উন্নত ব্যবস্থার মাধ্যমে।
অ্যাথেনার মাধ্যমে নাসা কেবল গবেষণার কাজ দ্রুত করছে না, বরং বৃহৎ পরিসরের জটিল গণনার ক্ষেত্রেও নিখুঁত ফল পাচ্ছে। পৃথিবীর জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের বিশ্লেষণ, মহাকাশযান পরিচালনা, রকেট উৎক্ষেপণ ও চন্দ্রযান ও মঙ্গলে যানের অবতরণ পরিকল্পনায় অ্যাথেনার সিমুলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটখাটো একটি গণনার ত্রুটিও কোটি কোটি ডলারের মহাকাশ মিশনের ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। এজন্য অ্যাথেনার নির্ভুলতা ও দ্রুততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্যাথেনা কেবল একটি মেশিন নয়; এটি গবেষকদের এমন এক সঙ্গী, যা মানুষের অসাধ্যকে সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসে। অ্যাথেনার মাধ্যমে হাজার হাজার কাল্পনিক পরিস্থিতি পরীক্ষা করা যায়, যা মহাকাশযানের নিরাপদ ও সঠিক পরিচালনায় অপরিহার্য। এছাড়া পৃথিবীর দিকে আসা গ্রহাণু বা অ্যাস্টেরয়েডের পথ ট্র্যাকিং করার মতো জটিল কাজও এটি দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করতে সক্ষম।
অ্যাথেনা কেবল মহাকাশ গবেষণার জন্য নয়, এআই বড় মডেল প্রশিক্ষণ ও বিশাল ডেটা বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর শক্তিশালী মডুলার আর্কিটেকচার গবেষকদের বড় ডেটাসেট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে স্বাধীনতা দেয়। ভবিষ্যতে চন্দ্রযান, মঙ্গলযান ও গভীর মহাকাশ অনুসন্ধান আরও সঠিক ও দ্রুত হবে অ্যাথেনার মাধ্যমে।
বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, অ্যাথেনা কেবল গতিশীল ও শক্তিশালী নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে কার্যকরও বটে। বিদ্যুতের খরচ কমানোর পাশাপাশি এটি কুলিং সিস্টেমের উন্নত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবেশের ওপরও কম প্রভাব ফেলে। এটি গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প সম্পাদনেও সহায়তা করছে, কারণ হার্ডওয়্যার আপগ্রেড করা যায় সহজভাবে, ফলে গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
অ্যাথেনার এই ক্ষমতা নাসাকে প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্তে নিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের চোখে একটি শক্তিশালী কম্পিউটার মানেই দ্রুত ফাইল লোড বা গেমিং, কিন্তু নাসার জন্য তা হলো ৫০০ বছরের কাজকে মাত্র এক দিনে নামিয়ে আনা। অ্যাথেনার মাধ্যমে নাসা পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, মহাকাশমিশন পরিকল্পনা ও সিমুলেশন, জলবায়ু গবেষণা এবং রকেট উৎক্ষেপণ সবই আরও নিখুঁত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে পারছে।
নাসার বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, অ্যাথেনার এই ক্ষমতা ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধান, চন্দ্র ও মঙ্গলের অভিযান এবং বৃহৎ বিজ্ঞানী দলের গবেষণার জন্য এক বিপ্লবী সাফল্য হবে। এটি কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, বরং মানবজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।