প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় ভোটকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভোটে টাকা লেনদেনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে নন্দীগ্রাম উপজেলার পারশুন গ্রামে এই ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের নিরবতা ভেঙে হঠাৎ করেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, জামায়াতের কয়েকজন কর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি ভোটারদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করছিলেন। অন্যদিকে জামায়াত দাবি করছে, তাদের কর্মীদের মিথ্যা অভিযোগে আটক করে মারধর করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই সংঘর্ষে রূপ নেয় পরিস্থিতি।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, পারশুন গ্রামের আব্দুল আজিজের বাড়িতে গভীর রাতে কয়েকজন লোকের সমাগম দেখে তারা সেখানে যান। তাদের দাবি, ওই বাড়িতে জামায়াতের কিছু নেতাকর্মী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বেলাল ভোটারদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাইলে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে বিএনপি কর্মীরা বেলালসহ দুজনকে আটক করে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানার বাড়িতে নিয়ে যান।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই জামায়াতের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা মাসুদ রানার বাড়িতে ঢুকে তাকে ও তার ভাইকে মারধর করে এবং বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই সময় আটক দুজনকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
হামলার সময় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানার বাড়িসহ অন্তত তিনটি বাড়ি এবং একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় মাসুদ রানাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে তার স্বজনেরা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের সেই হামলায় পরিবার-পরিজন চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়ে।
এদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপির অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। বগুড়া-৪ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ দাবি করেছেন, তাদের পক্ষ থেকে কোনো হামলা চালানো হয়নি। বরং বিএনপির মিছিল থেকেই তাদের নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ করা হয়। তিনি বলেন, জামায়াতের কর্মী গালিবকে মারধর করে আহত করা হয়েছে এবং আরও দুজন কর্মীকে মিথ্যা অভিযোগে আটক রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছে।
এই ঘটনার পরপরই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বগুড়া জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতোয়ার হোসেন জানান, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কোনো পক্ষই মামলা করেনি। মামলা হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বগুড়া-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোশারফ হোসেন ঘটনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পুলিশের উপস্থিতিতে কীভাবে এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। তার আশঙ্কা, যদি এভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তবে ভোটের দিন আরও বড় ধরনের সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি জানান, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘর্ষ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রতিফলন। ভোট সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, মিছিল-মিটিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সহিংসতার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে তারা মনে করছেন।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত। পারশুন গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে মানুষের দৌড়ঝাঁপ দেখে তারা ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি। অনেক পরিবার রাতটা নির্ঘুম কাটিয়েছে। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে সাধারণ মানুষ যেন নিরাপত্তাহীনতায় না পড়ে, সে বিষয়ে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পুলিশ বলছে, তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে, তবে সংঘর্ষের সময় ক্ষয়ক্ষতি ও আহতের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বগুড়ায় বিএনপি ও জামায়াতের এই সংঘর্ষ আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য একটি সতর্কবার্তা বলেই মনে করছেন অনেকেই। নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত ও সহিংসতামুক্ত রাখতে সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।