প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল দিরাই-শাল্লায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তৈরি হয় এক ব্যতিক্রমী আবহ। দীর্ঘদিন পর ভোট দিতে পারার অনুভূতি, প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। এই আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির শাল্লা উপজেলার দাউদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দেওয়ার পর তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দিরাই-শাল্লাবাসী উন্নয়ন ও নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রত্যাশায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে বেছে নেবেন, ইনশাআল্লাহ।
সকালবেলার কুয়াশা কাটতে না কাটতেই হাওরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভোটাররা নৌকা, মোটরসাইকেল ও হেঁটে কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন। দাউদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও দেখা যায় নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিশির মনির নির্ধারিত সময়েই কেন্দ্রে পৌঁছে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেন। কেন্দ্রের ভেতরে নির্বাচন কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছিলেন, বাইরে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি।
ভোট দেওয়ার পর স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শিশির মনির বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর মানুষ অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন—এটি তাদের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি দাবি করেন, সকাল থেকেই ভোটারদের মধ্যে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করছে। তবে তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেওয়া; নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে ভোটারদের রায়ের ওপর।
দিরাই-শাল্লা আসনটি সুনামগঞ্জ-২ নামে পরিচিত। বিস্তীর্ণ হাওরবেষ্টিত এই অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা, বন্যা ও নদীভাঙন, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ—এসব ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে। বর্ষাকালে অনেক গ্রাম জলাবদ্ধ থাকে, শুকনো মৌসুমে সড়ক ও নৌপথের সমন্বয়ই একমাত্র ভরসা। স্থানীয়রা বলছেন, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নে রূপ নিক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, ভোটাররা সকাল থেকেই কেন্দ্রমুখী। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘ সময় পর একটি অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে ভোট দিতে পারা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কিছু ভোটার সতর্কতার সুরে বলেছেন, দিনের শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কেমন থাকে সেটিই আসল বিষয়।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে প্রশাসন ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে টহল দিচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল সরবরাহ করা হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাওরাঞ্চলে ভোটের হার ও পরিবেশ অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন ঘটায়। কারণ এই অঞ্চলে স্থানীয় উন্নয়ন প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, দলীয় অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন—সব মিলিয়ে ফলাফল নির্ধারিত হয়। শিশির মনির জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ; আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার সক্রিয়তা তাকে আলোচনায় রেখেছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় এবং ভোটারদের সমর্থন পেতে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
ভোটকেন্দ্রের বাইরে কয়েকজন প্রবীণ ভোটার জানান, তারা চান শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হোক। একজন কৃষক বলেন, “আমাদের এলাকায় রাস্তা-ঘাট, বাঁধ ও ফসল রক্ষার বিষয়টাই বড়। যে-ই নির্বাচিত হোক, যেন হাওরের মানুষের কথা সংসদে তোলে।” আরেক নারী ভোটার বলেন, “আমরা ঝামেলা চাই না। ভোট দিতে পারলেই শান্তি।”
ভোটগ্রহণ শুরু থেকে দুপুর পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। তবে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট মহল মনে করিয়ে দিচ্ছে, পুরো দিনের চিত্র, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়েই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে, দিরাই-শাল্লার হাওরাঞ্চলে ভোটের দিনটি শুরু হয়েছে অংশগ্রহণ ও প্রত্যাশার মিশেলে। শিশির মনিরের আশাবাদী বক্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভোটারদের হাতে। দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগকে ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে, তা এই জনপদের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। এখন অপেক্ষা দিনের শেষে সেই আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবতায় রূপ নেয়, তার।










