প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে যখন উৎসবমুখর ও সতর্ক পরিবেশ, তখন সপরিবারে ভোট দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা-১৭ আসনের অন্তর্ভুক্ত গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তার সঙ্গে একই কেন্দ্রে ভোট দেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রস্তুতি ছিল। আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি এবং তার দুই কন্যা জাফিয়া রহমান ও জাশিয়াও একই কেন্দ্রে ভোট দেবেন বলে জানা গেছে।
ভোটকেন্দ্রে তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক উপস্থিতি দেখা যায়। কেন্দ্রের আশপাশে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল লক্ষ্য করা যায়। সকাল থেকেই গুলশান এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের পালার অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ভোট দিতে আসেন, যা নির্বাচনের দিনটিকে এক ধরনের নাগরিক উৎসবে পরিণত করে।
ভোট প্রদান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে তারেক রহমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন—সেই পরিবেশ বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। তার বক্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর, তবে একই সঙ্গে নির্বাচনকে ঘিরে সামগ্রিক স্থিতিশীলতার আহ্বানও।
ঢাকা-১৭ আসনটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও কূটনৈতিক এলাকাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭০৯, নারী ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ০৬০ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৮ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।
এই আসনে শুরুতে ১১ জন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে চারজন প্রার্থী তারেক রহমানকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণে পরিবর্তন আসে। তারেক রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামান, জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিক আহমদে, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ উল্লাহসহ অন্যরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ মুহূর্তের সমর্থন ঘোষণায় ভোটের লড়াইয়ে কৌশলগত প্রভাব পড়তে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ভোটারদের রায়ের ওপর।
নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানের ভোটদানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দলীয় নেতাকর্মীরা তা শেয়ার করে সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রার্থীদের ভোটদান সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, উচ্চপ্রোফাইল প্রার্থীদের ভোটদান সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
ভোটকেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ এক নারী ভোটার বলেন, “নির্বাচনের দিনটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে।” আরেক তরুণ ভোটার জানান, “আমাদের ভোট যেন সঠিকভাবে গণনা হয়, সেটাই প্রত্যাশা।” এই প্রত্যাশার মধ্যেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রাণ নিহিত—এমন মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
তারেক রহমানের সপরিবারে ভোটদান রাজনৈতিকভাবে একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসা একদিকে নাগরিক দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্থিতি ও আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবেও দেখা হয়। বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরিবারসহ ভোট দেওয়া নতুন নয়, তবে শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রে তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। সারা দেশে একযোগে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে নির্বাচন স্থগিত থাকায় সেখানে ভোট হচ্ছে না। কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটারদের শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাপক সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজধানীর আসনগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় থাকায় ঢাকা-১৭ আসনের ফলাফল নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকা হওয়ায় এখানে ভোটের হার, প্রার্থীদের প্রচারণা এবং ভোট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারেক রহমান ভোটারদের উদ্দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের শক্তি জনগণের হাতে। জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তার এই বক্তব্যে নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপের মধ্যেও সহনশীলতার বার্তা ছিল স্পষ্ট।
দিন শেষে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার দিকে নজর থাকবে সবার। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার মাধ্যমে জানা যাবে কে হচ্ছেন ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তবে ফলাফল যাই হোক, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল সাফল্য—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের দিনটি তাই শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব পালনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।










