প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে দেশজুড়ে ভোটগ্রহণ চলাকালে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৪৮৬টি ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনার তথ্য জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি সমন্বয় সেল। একই সময়ে ৫৯টি জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাই, প্রার্থীদের ওপর হামলা, পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। নির্বাচন ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি এসব বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও অনিয়ম নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সেলের দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। ১৩৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ১৪টি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিনটি স্থানে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে এবং ছয়জন প্রার্থী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে জানানো হয়। ভোট দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এসেছে ১৮টি স্থানে। অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে চার জায়গায় এবং নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে ৩৩টি ক্ষেত্রে।
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বেশ কিছু কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কিছু স্থানে ভোটগ্রহণ সাময়িক বন্ধ রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর পুনরায় শুরু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। বিশাল এই ভোটারসমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে আজ ভোট হচ্ছে ২৯৯টি আসনে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
২৯৯টি আসনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৫০টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল। ১ হাজার ৭৫৫ জন দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী লড়ছেন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন, যার মধ্যে ২০ জন স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নিরাপত্তা জোরদার করতে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নজরদারির জন্য প্রায় এক হাজার ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কেন্দ্র ও আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছে।
ভোটের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রায় চার কোটি তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ জন ভোটারের মধ্যে এ বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এবারের নির্বাচনে একটি নতুন সংযোজন ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদান। একই ব্যবস্থায় ভোট দিয়েছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কারাবন্দিরাও। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পরিসর বাড়িয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক সংস্থাও এবারের নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বড় পরিসরের নির্বাচন হওয়ায় কিছু এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া।
নির্বাচনী সহিংসতার খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। কিছু ভিডিও ও ছবি ভাইরাল হয়েছে, যদিও সেগুলোর সবগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচন কমিশন নাগরিকদের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং তথ্য যাচাই করে প্রচারের অনুরোধ করেছে।
দুপুর পর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যান সামগ্রিক চিত্রের একটি অংশমাত্র। বিকেল ও সন্ধ্যার পর চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া গেলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, একটি নির্বাচন কেবল ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও ফল ঘোষণার নিরপেক্ষতাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা নির্ধারণ করে।
ভোটারদের প্রত্যাশা স্পষ্ট—তারা চান ভয়ভীতি ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে এবং তাদের ভোট যেন সঠিকভাবে গণনা হয়। বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও দেশের বহু কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। দিনশেষে কতটা অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, তা নির্ভর করবে সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ পদক্ষেপের ওপর।










