শান্তিপূর্ণ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষে চলছে গণনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
শান্তিপূর্ণ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষে চলছে গণনা

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বৃহস্পতিবার দেশের সব প্রান্তে সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। সারাদেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ চলেছে ৪২ হাজার ৯৫৮টি কেন্দ্রে, যেখানে ভোটাররা সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। শেরপুর-৩ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত থাকায় ওই আসনে ভোট হয়নি।

এতদিন ধরে অপেক্ষার পর দেশের মানুষ আজ তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। নির্বাচনের সঙ্গে সংগে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পর্কিত গণভোটে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–র মাধ্যমে জাতীয় গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কারণ দীর্ঘ সময় পর প্রথমবার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পেরেছে এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

আজকের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, কারণ দলটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই নিষিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী ভোটকেন্দ্রে চোখে পড়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। নির্বাচনী দিনকে ঘিরে ছিল এক ধরনের ‘ঈদের আমেজ’। মানুষ বাড়ি ফিরে ভোট দিতে পারার জন্য সরকারের উদ্যোগে চার দিনের ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রাজধানী ও অন্যান্য শহরের বাসটার্মিনাল, রেলস্টেশন এবং লঞ্চঘাটে গ্রামের বাড়ি ফিরতে মানুষদের ঢল নামে।

বিভিন্ন বয়সী ভোটারদের মধ্যে বিশেষ করে তরুণরা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত। ভোটদানের আনন্দ এবং উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রগুলিতে ভোটাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে patiently তাদের ভোট প্রদান করেছেন। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে নির্বাচন কমিশন ক্যারাভ্যান, ভ্রাম্যমাণ বাহন ও মিডিয়ার বিভিন্ন প্রচারণা ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এক লাখ সেনাবাহিনী সদস্যসহ মোট ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

এবারের নির্বাচন ডিজিটাল নির্ভর এবং উৎসবমুখর হিসেবে নজিরবিহীন। নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক। প্রার্থীরা সেগুলো ব্যবহার করে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন, আর বড় ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই নির্বাচনী কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এবার প্রথমবার একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট ব্যবহার করেছেন—সাদা সংসদ নির্বাচন ও গোলাপি গণভোটের জন্য।

নির্বাচনকেন্দ্রে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল নজিরবিহীন। ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ২৫ হাজার ৭শ ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার ড্রোন ভোটকেন্দ্রে আকাশ থেকে নজরদারি করেছে। এবারের নির্বাচন প্রমাণ করেছে, সুষ্ঠু ও নিরাপদ ভোট আয়োজনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয় কতটা কার্যকর।

এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন। দীর্ঘ সময় পর ভোটপ্রাপ্তির আনন্দে নারী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়েছে।

এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে দেখিয়েছে, দীর্ঘায়িত রাজনৈতিক সংকট ও অতীতের সহিংসতার পরও দেশের মানুষ এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস রাখে। ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের কারণে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

আজকের ভোট গণনার মাধ্যমে জানা যাবে, কে হবে দেশের ভবিষ্যৎ সরকার এবং সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত গণভোটের ফলাফল। এই গণনা প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর এক স্বাধীন ও সুষ্ঠু ভোটের আনন্দ উপভোগ করেছেন। বাংলাদেশ এক নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনায় প্রবেশ করেছে, যেখানে জনগণের মতামত ও ভোটের অধিকার সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থাপিত হবে।

এভাবেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দেশের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ভোট প্রক্রিয়া, উদ্দীপ্ত ভোটার এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার সমন্বয় দেখিয়েছে, যে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রশাসন একসাথে মিলিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত, সুষ্ঠু এবং নিরাপদ নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম। আজকের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

আজকের এই নির্বাচন কেবল ভোটের হিসাব নয়, বরং গণতন্ত্রের বিজয়ের এক চূড়ান্ত উদযাপন। ভোটারদের অংশগ্রহণ, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট প্রদান দেশবাসীর জন্য এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে, যা আগামী দিনের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত