প্রকাশ: ১৬ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন মোড় নিচ্ছে বর্তমান প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহিষ্কার অভিযান—এবং এবার তার লক্ষ্য শুধু অবৈধ অভিবাসীরা নন, বরং বৈধ অস্থায়ী সুরক্ষা (টিপিএস) প্রাপ্ত অভিবাসীরাও রয়েছেন ঝুঁকির মুখে।
যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপর্যস্ত দেশ থেকে পালিয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়া প্রায় ১২ লাখ অভিবাসীর অস্থায়ী সুরক্ষা বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার পূর্বসূরিরা। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তারা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস এবং কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সচিব ক্রিস্টি নোম এসব অভিবাসীর সুরক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেন।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাইতির ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮৭ জন নাগরিক, যাঁরা সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। একই রকম দুর্ভোগে পড়েছেন ভেনেজুয়েলার ৩ লাখ ৪৮ হাজার নাগরিক এবং ১১ হাজার ৭০০ আফগান, যারা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের আশঙ্কায় দিন কাটছে।
একজন হাইতিয়ান অভিবাসী বলেন, “আমি কখনো অবৈধভাবে আসিনি, কোনো অপরাধ করিনি। কিন্তু এখন যদি আমাকে হাইতিতে ফিরে যেতে হয়, তবে প্রার্থনা করব যেন গুলি খেয়ে মরতে না হয়।” এই অনুভব বহু টিপিএসপ্রাপ্ত অভিবাসীর ভিতরে চলমান ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি।
১৯৯৯ সাল থেকে এই সুরক্ষা পাওয়া হন্ডুরাসের ৫২ হাজার ও নিকারাগুয়ার ৩ হাজার নাগরিকের সুরক্ষাও বর্তমানে বাতিলের মুখে। হন্ডুরাসের যুক্তরাষ্ট্রস্থ দূতাবাসের উপপ্রধান লিওনার্দো ভালেনজুয়েলা নেদা বলেন, “আমরা এখনও এত বিশাল সংখ্যক অভিবাসী ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত নই।”
এদিকে শুধু টিপিএসই নয়, বাইডেন প্রশাসনের সময়ে চালু হওয়া মানবিক ‘প্যারোল’ সুবিধা পাওয়া অভিবাসীরাও এখন সরাসরি বহিষ্কারের মুখে। আদালতের প্রাথমিক শুনানির সুযোগ ছাড়াই এসব প্যারোলপ্রাপ্ত অভিবাসীকে আটক করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) দ্রুত দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। অধিকারকর্মীরা এই অভিযানের ভয়াবহতাকে অভিহিত করছেন ‘রিমুভালপালুজা’—অর্থাৎ ‘বহিষ্কারের উৎসব’ নামে।
এই অভিযানে আরও এক ধাপ কঠোর নীতির সংযোজন হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্থির করেছে, যেসব অভিবাসী অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন, তারা আর বহিষ্কার কার্যক্রম চলাকালীন জামিনের আবেদন করতে পারবেন না। এমনকি বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আটক অবস্থায়ই রাখা হবে। ICE-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টড লায়ন্স এক স্মারকে জানান, এই প্রক্রিয়া মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও চলতে পারে। এটি লক্ষাধিক নতুন অভিবাসীর ওপর প্রযোজ্য হবে।
এই বহিষ্কার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে কংগ্রেস চার বছর মেয়াদে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে। অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে নতুন বন্দিশিবির, আদালত কার্যক্রম ও বহিষ্কার ফ্লাইট পরিচালনার জন্য।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, “টিপিএস কোনো দিনই স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি ছিল না। বাইডেন প্রশাসন এই প্রোগ্রামগুলোর অপব্যবহার করেছে। এখন সময় এসেছে এই ব্যবস্থার সংস্কারের।”
ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশল স্পষ্ট: বৈধ এবং অবৈধ—সব ধরনের অভিবাসীর বিরুদ্ধেই কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে। মানবিকতা নয়, বরং কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন অভিবাসন নীতির চালিকাশক্তি। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন বাস্তবতায় এক নতুন ও দুঃসহ অধ্যায়ের সূচনা ঘটলো, যেখানে মানবিক আশ্রয়ের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।