রমজানে অফিস-আদালত-ব্যাংকে নতুন সময়সূচি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৪ বার
রমজানে অফিস সময়সূচি পরিবর্তন

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হিজরি ১৪৪৭ সনের পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দেশের সরকারি ও আর্থিক কার্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সময়সূচি কার্যকর হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যাওয়ার ঘোষণার পর থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় এবং বৃহস্পতিবার থেকে সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সংশোধিত কর্মঘণ্টা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোজাদারদের ধর্মীয় অনুশীলন ও দৈনন্দিন কাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সেহরি ও ইফতারের সময় বিবেচনায় এনে এ সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি প্রশাসনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন অফিস সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রমজান মাসজুড়ে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত জোহরের নামাজের জন্য বিরতি থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটি যথারীতি শুক্রবার ও শনিবার বহাল থাকবে। এর আগে সরকারি অফিস সময় ছিল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত, ফলে রমজানে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রমজানে কর্মঘণ্টা কমানো নতুন কিছু নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রশাসনিক রীতি। এর ফলে কর্মীদের কর্মক্ষমতা বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশীলনের সুযোগও নিশ্চিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সময়সূচি কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সহায়ক, কারণ রোজার সময় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা অনেকের জন্য শারীরিকভাবে কষ্টকর হতে পারে। তাই সময় কমিয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ১১ ফেব্রুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে রমজানের জন্য নিম্ন আদালতের সময়সূচি নির্ধারণ করে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আদালতের বিচারিক কার্যক্রম চলবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত, আর অফিস সময় থাকবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। এখানেও দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত নামাজের বিরতি থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট ও এর অধীন অন্যান্য আদালতের সময়সূচি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে নির্ধারণ করেছে, যাতে বিচারপ্রার্থীরা সেবা পেতে অসুবিধায় না পড়েন।

বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, রমজানে সময়সূচি সমন্বয় বিচার কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দেয় না, বরং পরিকল্পিত শুনানি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক মামলার তালিকা প্রস্তুতের মাধ্যমে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। আইনজীবীদের একটি অংশও বলছেন, এই সময়সূচি তাদের জন্য সুবিধাজনক, কারণ রোজার সময় দীর্ঘ সময় আদালতে থাকা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

ব্যাংকিং খাতেও বড় ধরনের সময় পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ ফেব্রুয়ারি জারি করা সার্কুলারে জানায়, রমজান মাসে সব তফসিলি ব্যাংক সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে গ্রাহক লেনদেন চলবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত। একইভাবে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত নামাজের বিরতি থাকবে। যদিও এ বিরতির সময়েও বিকল্প ব্যবস্থায় জরুরি গ্রাহকসেবা চালু রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, রমজানে লেনদেনের সময় কমানো হলেও ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অনলাইন সেবার কারণে গ্রাহকদের কার্যক্রমে বড় কোনো প্রভাব পড়ে না। বরং মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এটিএম সেবা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকায় লেনদেনের চাপ সহজেই সামাল দেওয়া যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থা রমজানকালীন সময়সূচি পরিবর্তনের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

এদিকে দেশের পুঁজিবাজারেও রমজান উপলক্ষে সময়সূচি সমন্বয় করা হয়েছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ জানিয়েছে, রমজানে লেনদেন শুরু হবে সকাল ১০টা থেকে এবং চলবে দুপুর ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত। এরপর ১টা ৪০ মিনিট থেকে ১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত পোস্ট-ক্লোজিং অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সময় কমলেও লেনদেনের পরিমাণে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম, কারণ বিনিয়োগকারীরা আগেভাগেই লেনদেন সম্পন্ন করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ব্যাংক, বিমা, ডাক, রেলওয়ে, হাসপাতাল, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ আইন ও বিধি অনুযায়ী জনস্বার্থ বিবেচনায় সময়সূচি নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ যেসব খাতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া জরুরি, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা সময়সূচি চালু থাকতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও নিরাপত্তা খাতে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রমজান শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনধারার ওপরও প্রভাব ফেলে। কর্মঘণ্টা কমানো, যানজটের সময়সূচি বদলানো, বাজার খোলা রাখার সময় পরিবর্তন—সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক দৈনন্দিন ছন্দে পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছরই বিশেষ সময়সূচি প্রণয়ন করে থাকে, যা নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন সময়সূচি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, রমজানে কাজের সময় কিছুটা কম হওয়ায় পরিবারকে সময় দেওয়া, ইবাদত করা এবং বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। আবার ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের একটি অংশ বলছেন, সময় কমলেও কাজের চাপ কমে না, তাই দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। তবুও অধিকাংশই মনে করেন, ধর্মীয় মাসের বিশেষ পরিবেশ বিবেচনায় এই পরিবর্তন যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পবিত্র রমজান উপলক্ষে নতুন সময়সূচি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতা ও ধর্মীয় চাহিদার সমন্বিত প্রতিফলন। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে এই সময়সূচি কার্যকর করায় দেশের সামগ্রিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত