নারীরা কেন রক্তশূন্যতায় বেশি ভোগেন?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৭১ বার
নারীরা কেন রক্তশূন্যতায় বেশি ভোগেন?

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া আজ বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এটি পুরুষদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, কিন্তু নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি এই সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৩০ শতাংশই রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের শারীরিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, খাদ্যাভ্যাস এবং সচেতনতার অভাব একযোগে এই সমস্যার প্রধান কারণ।

নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঋতুস্রাব। প্রতি মাসের নিয়মিত রক্তক্ষরণের কারণে শরীর থেকে রক্ত বের হয়, যা অনেক সময় খাবারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে যাদের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়, তাদের ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ঋতুস্রাবের প্রাকৃতিক চক্র নারীর হিমোগ্লোবিন কম হওয়ার সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো গর্ভাবস্থা এবং মাতৃদুগ্ধ দান। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরে রক্তের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কারণ, গর্ভস্থ শিশুর জন্য মায়ের শরীরকে অতিরিক্ত রক্ত এবং পুষ্টি সরবরাহ করতে হয়। সন্তান জন্মের সময় রক্তক্ষরণ এবং শিশুকে দুধ খাওয়ানোর প্রক্রিয়াও নারীর আয়রনের ঘাটতি তৈরি করে। এই সময় নারীদের নিয়মিত আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ না করলে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ে।

খাদ্যাভ্যাস ও অপুষ্টিও এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পরিবারের সবার খাওয়ার পরে নারীরা অনেক সময় খাবার গ্রহণ করেন, যেখানে পর্যাপ্ত পুষ্টি বা আয়রন থাকে না। ফলিক অ্যাসিড, আয়রন এবং ভিটামিন বি-১২-এর অভাবে নারীদের হিমোগ্লোবিন কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পর্যাপ্ত খাবার খাওয়া নয়, খাদ্যের পুষ্টিমানও জরুরি। অনেকে আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে বা সচেতনতার অভাবে সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন না, যা রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায়।

কৃমির সংক্রমণও নারীদের অ্যানিমিয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। পরিচ্ছন্নতার অভাবে শরীরে কৃমি প্রবেশ করলে তা রক্ত চুষে নেয়, যা আয়রনের ঘাটতি তৈরি করে। নারীরা গৃহস্থালি কাজে বেশি ব্যস্ত থাকায় অনেক সময় এই ছোট ছোট লক্ষ্মণগুলো উপেক্ষা করেন। ফলে, রক্তশূন্যতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং অবহেলার কারণে তা গুরুতর অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।

রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার যেমন পালং শাক, কচু শাক, ডিম, কলিজা, ডালিম ইত্যাদি নিয়মিত খেলে শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বজায় থাকে। ভিটামিন সি যুক্ত খাবার যেমন লেবু, কমলা বা টক জাতীয় ফল শরীরে আয়রনের শোষণ বাড়ায়। গর্ভবতী নারীরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়া অতিরিক্ত চা বা কফি খাওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো আয়রনের শোষণকে বাধা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রক্তশূন্যতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে কার্যকর। পাশাপাশি পরিবারের ও সমাজের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ, যেন নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে অবহেলা না করেন।

রক্তশূন্যতা শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, এটি নারীর দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে। এই সমস্যার কারণে তারা ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব, মাথা ঘোরা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যার সম্মুখীন হন। গর্ভাবস্থায় রক্তশূন্যতা মা ও শিশুর জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোও নারীদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, খাদ্যাভ্যাসের উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট প্রদান এসব উদ্যোগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তবে ব্যক্তিগত স্তরে প্রতিটি নারীর নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মোটকথা, নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতা বৃদ্ধির পেছনে ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা, অপুষ্টি, কৃমির সংক্রমণ এবং সচেতনতার অভাব মূল ভূমিকা পালন করে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব। রক্তশূন্যতা শুধুমাত্র শারীরিক সমস্যা নয়, এটি নারীর মানসিক ও সামাজিক জীবনের ওপরও প্রভাব ফেলে, তাই এটি প্রতিরোধ করা নারীর সুস্থ জীবন ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত