প্রকাশ: ৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের বিভিন্ন শহরের বাজারগুলোতে ততই বাড়ছে কেনাকাটার ব্যস্ততা। নতুন পোশাক, প্রসাধনী কিংবা বিভিন্ন উপহার সামগ্রীর পাশাপাশি ঈদের কেনাকাটার তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে থাকে জুতা বা স্যান্ডেল। অনেকের কাছে নতুন পোশাকের সঙ্গে মানানসই জুতা বা স্যান্ডেল ছাড়া ঈদের সাজ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই উৎসবকে ঘিরে তাই দেশের বিভিন্ন স্থানের জুতার বাজারেও বাড়তে শুরু করেছে ক্রেতাদের আনাগোনা। উত্তরাঞ্চলের জেলা রংপুরেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেলের কারিগরদের কর্মশালায় এখন চলছে ব্যস্ততম সময়।
রংপুর শহরের বিভিন্ন অলিগলি ও ছোট ছোট কারখানায় প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন কারিগররা। তাদের হাতের নিপুণ কারুকাজে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের স্যান্ডেল ও জুতা। ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের চাহিদা বাড়ায় কারিগরদের হাতে এখন যেন বিশ্রামের সময় নেই। কেউ চামড়া কাটছেন, কেউ সেলাই করছেন, আবার কেউবা শেষ পর্যায়ে পালিশ বা রং করার কাজে ব্যস্ত।
রেডিমেড বা মেশিনে তৈরি জুতার বাজারে নানা দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের আধিপত্য থাকলেও রংপুরের হাতে তৈরি স্যান্ডেলের দোকানগুলো এখনও নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে। বহু পুরোনো এই ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে মূলত দক্ষ কারিগরদের পরিশ্রম এবং কিছু সচেতন ক্রেতার আগ্রহের কারণে।
রংপুর শহরের একজন অভিজ্ঞ কারিগর তপন দাস এই পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় তিন পুরুষ ধরে। তার পরিবার বহু বছর ধরে হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেল তৈরির কাজ করছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে কারখানায় কাজ শিখেছেন। এখন তিনি নিজেই নতুন প্রজন্মের কয়েকজন কারিগরকে এই কাজ শেখাচ্ছেন।
তপন দাস বলেন, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেলের চাহিদা বেড়ে যায়। অনেক ক্রেতাই বিশেষভাবে তাদের কাছে অর্ডার দিয়ে জুতা বানিয়ে নেন। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একসময় যে চামড়া শিল্পকে ঘিরে রংপুরে বেশ ভালো ব্যবসা চলত, এখন তা আগের মতো নেই। বড় বড় ফ্যাক্টরি ও আধুনিক যন্ত্রের কারণে ছোট কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
তার মতে, হাতে তৈরি জুতার গুণগত মান ভালো হলেও বাজারে যেসব মেশিনে তৈরি জুতা আসে, সেগুলোর ফিনিশিং ও ডিজাইনের কারণে অনেক ক্রেতা সেদিকেই ঝুঁকে পড়েন। ছোট কারখানাগুলো সেই প্রতিযোগিতায় সবসময় সমানভাবে টিকে থাকতে পারে না। তিনি মনে করেন, এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ জরুরি। না হলে ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প হারিয়ে যেতে পারে।
তবু সব প্রতিকূলতার মাঝেও অনেক ক্রেতা এখনো আস্থা রাখেন হাতে তৈরি জুতার ওপর। রংপুরের স্থানীয় বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বহু বছর ধরেই হাতে তৈরি জুতা ব্যবহার করছেন। তিনি জানান, ব্র্যান্ডের বা রেডিমেড জুতার তুলনায় হাতে তৈরি জুতা অনেক বেশি টেকসই এবং আরামদায়ক।
রহিম উদ্দিন বলেন, বাজারে অনেক সময় ব্র্যান্ডের জুতা কিনতে গেলে বেশি দাম দিতে হয়, কিন্তু সেটি কতদিন টিকবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। অন্যদিকে হাতে তৈরি জুতা কিনলে কারিগররা নিজেরাই গ্যারান্টি দেন এবং প্রয়োজনে মেরামতও করে দেন। ফলে তুলনামূলক কম খরচে ভালো মানের জুতা পাওয়া যায়।
রংপুরের এক কলেজ শিক্ষার্থীও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশীয় শিল্পের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি হাতে তৈরি জুতা কিনতে এসেছেন। তার মতে, এই ধরনের জুতার গুণগত মান ভালো এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইনও করা যায়। তাই বিদেশি বা ব্র্যান্ডের পণ্যের বদলে দেশীয় কারিগরদের তৈরি জুতাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেল তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ শ্রমসাধ্য। আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হয় প্রতিটি জোড়া জুতা। কারিগররা ধৈর্য ও দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করেন। চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে কাটা, সেলাই, আঠা লাগানো এবং শেষ পর্যন্ত রং ও পালিশ—সবকিছুই করতে হয় হাতে।
কারিগর শিমুল দাস জানান, তারা সাধারণত ট্যানারি থেকে চামড়া সংগ্রহ করেন। এরপর নির্দিষ্ট ডিজাইন অনুযায়ী একটি প্যাটার্ন তৈরি করা হয়। সেই প্যাটার্ন অনুসারে চামড়া কেটে প্রস্তুত করা হয় জুতার বিভিন্ন অংশ। এরপর কেউ ফিতা তৈরি করেন, কেউ ইনসোল বানান, আবার কেউ সেলাই বা আঠা লাগানোর কাজ করেন। সবশেষে রং ও পালিশের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ জোড়া স্যান্ডেল তৈরি হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপে আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন হয়। ফলে একটি জোড়া জুতা তৈরি করতে অনেক সময় এবং শ্রম দিতে হয়। তবুও কারিগররা ভালো মান বজায় রাখার জন্য প্রতিটি কাজ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করেন।
রংপুরের এসব দোকানে সাধারণত ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় এক হাজার টাকার মধ্যে একেক জোড়া স্যান্ডেল বিক্রি হয়। ডিজাইন, চামড়ার মান এবং কাজের সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে দাম কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, রংপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫টি হাতে তৈরি স্যান্ডেলের কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় অনেক কারিগর কাজ করেন এবং তাদের জীবিকা নির্ভর করে এই শিল্পের ওপর। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দেশি-বিদেশি বড় ব্র্যান্ডের জুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ছোট কারিগরদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে আধুনিক ডিজাইন ও উন্নত ফিনিশিংয়ের পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় হাতে তৈরি জুতার চাহিদা আগের মতো নেই। ফলে অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
তবুও ঈদকে ঘিরে রংপুরের এই ছোট ছোট কর্মশালাগুলোতে এখনো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। কারিগরদের হাতে তৈরি প্রতিটি জোড়া জুতা যেন শুধু একটি পণ্য নয়, বরং বহু বছরের অভিজ্ঞতা, শ্রম এবং ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
স্থানীয়রা আশা করছেন, যদি এই শিল্পকে সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও উন্নত করা যায়, তাহলে হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেলের ঐতিহ্য নতুন করে বিকশিত হতে পারে। আর সেই সঙ্গে জীবিকা ফিরে পেতে পারেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য কারিগর।