মেসির হ্যাটট্রিকে ক্লোসের বিশ্বকাপ গোল রেকর্ড স্পর্শ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৬৫ বার

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কানসাস সিটির মাঠে রাতটা ছিল লিওনেল মেসির। বয়স ৩৮ ছুঁলেও তার পায়ের জাদু যেন এখনো থামার নাম নিচ্ছে না। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ জে-র প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলের জয় এনে দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন আর্জেন্টাইন এই কিংবদন্তি।

এটি বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অনেক বড় ম্যাচ জিতিয়েছেন। অনেক ফাইনালে আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে হ্যাটট্রিকের আনন্দ এতদিন তার পাওয়া হয়নি। কানসাস সিটির সেই অপেক্ষার শেষ হলো আলজেরিয়ার বিপক্ষে। বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখার মিশন শুরু করল দারুণ এক জয়ে। আর মেসি শুরু করলেন ইতিহাসের আরেকটি দরজা খুলে।

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ছন্দ তৈরি করেন। সেই ছন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেসি। আলজেরিয়া শুরুতে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার চাপ সামলাতে পারেনি। ম্যাচের ১৭ মিনিটে মেসি প্রথম গোল করেন। গোলটি শুধু আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেয়নি, ম্যাচের গতিপথও বদলে দেয়।

প্রথমার্ধে আলজেরিয়া কয়েকবার আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ বেশ শান্ত মাথায় সব সামলে নেয়। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজও সতর্ক ছিলেন। আলজেরিয়ার একটি আক্রমণ অফসাইডের কারণে থেমে যায়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে।

দ্বিতীয়ার্ধে মেসি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ৬০ মিনিটে তিনি দ্বিতীয় গোল করেন। এরপর ৭৬ মিনিটে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। তার তৃতীয় গোলের পর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসে কানসাস সিটি স্টেডিয়াম যেন কেঁপে ওঠে। মেসির চোখে ছিল শান্ত আনন্দ। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেন। কারণ তারা জানতেন, এই গোল শুধু ম্যাচের ফল নয়। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক বড় অধ্যায়।

এই তিন গোলের পর বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল হলো ১৬। জার্মানির সাবেক স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসে এতদিন এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। এখন সেই শীর্ষ আসনে তার পাশে দাঁড়ালেন মেসি। তবে তিনি এখনো ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যাননি। আর একটি গোল করলেই মেসি এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন।

মেসির বিশ্বকাপ গোলের পথ শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। তখন তিনি ছিলেন তরুণ প্রতিভা। সেই বিশ্বকাপে তিনি করেন ১ গোল। ২০১০ সালে গোল পাননি। ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রেখে করেন ৪ গোল। ২০১৮ সালে করেন ১ গোল। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে তিনি করেন ৭ গোল এবং আর্জেন্টিনাকে এনে দেন বিশ্বকাপ শিরোপা। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই ৩ গোল করে নিজের মোট গোলসংখ্যা নিয়ে গেলেন ১৬-তে।

এই ম্যাচে মেসির আরও একটি বড় মাইলফলক তৈরি হয়েছে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি ছিল তার ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এমন দিনে হ্যাটট্রিক করে তিনি যেন নিজের ক্যারিয়ারকে আরও একবার নতুন আলোয় ভাসালেন। জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০-এ। অনেকেই মনে করেন, আধুনিক ফুটবলে এত দীর্ঘ সময় একই মান ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মেসি বারবার সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করছেন।

আর্জেন্টিনার জন্য এই জয় মানসিক দিক থেকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা ২০২২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন। তাই ২০২৬ সালে তাদের ওপর চাপ বেশি। শিরোপা ধরে রাখা সব সময় কঠিন। প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়া সেই চাপ কিছুটা কমাবে। তার ওপর মেসির এমন পারফরম্যান্স দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে। কোচ লিওনেল স্কালোনির দল ম্যাচে খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি। তারা ধৈর্য ধরে খেলেছে এবং সুযোগ পেলে আঘাত করেছে।

আলজেরিয়ার জন্য ম্যাচটি হতাশার। দলটি ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে। এমন বড় মঞ্চে আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে শুরু করা সহজ ছিল না। প্রথম গোলের পর তাদের রক্ষণে ফাঁক বাড়তে থাকে। মেসিকে জায়গা দেওয়ার মূল্য তারা কঠিনভাবে দিয়েছে। ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার কোচও স্বীকার করেন, দলের ভুলগুলো মেসির মতো খেলোয়াড়ের বিপক্ষে বড় শাস্তি ডেকে আনে।

এই ম্যাচের মানবিক দিকও কম নয়। ফুটবল শুধু পরিসংখ্যান নয়। এটি আবেগের খেলা। কানসাস সিটির স্টেডিয়ামে হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক মেসির প্রতিটি স্পর্শে উল্লাস করেছেন। অনেকের হাতে ছিল তার নাম লেখা জার্সি। কেউ এসেছেন সন্তানকে নিয়ে। কেউ এসেছেন শুধু নিজের চোখে ইতিহাস দেখার জন্য। মেসির হ্যাটট্রিক তাদের জন্য স্মৃতির দিন হয়ে থাকবে।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসির এই অবস্থান এখন নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। তিনি কি পরের ম্যাচেই ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যাবেন? তিনি কি আরও একবার আর্জেন্টিনাকে শিরোপার পথে নিয়ে যাবেন? বয়স কি সত্যিই তার খেলায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে? আলজেরিয়ার বিপক্ষে পারফরম্যান্সের পর এসব প্রশ্নের উত্তর আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে।

তবে মেসিকে ঘিরে উত্তেজনার মাঝেও সতর্কতা জরুরি। বিশ্বকাপ দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। সামনে আরও কঠিন ম্যাচ অপেক্ষা করছে। গ্রুপ জে-তে আর্জেন্টিনাকে অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের বিপক্ষেও খেলতে হবে। তাই প্রথম ম্যাচের জয় যতই বড় হোক, পথ এখনো শেষ হয়নি। স্কালোনির দল তা ভালো করেই জানে।

মেসির জন্য এই রাতটি তবু আলাদা। কারণ এমন কিছু রাত থাকে, যা শুধু স্কোরলাইনে ধরা যায় না। এই রাত প্রমাণ করল, বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসি এখনো গল্প লিখছেন। তিনি শুধু অতীতের নায়ক নন। তিনি বর্তমানেরও বড় চরিত্র। আর কানসাস সিটির হ্যাটট্রিক সেই কথাই আরও একবার মনে করিয়ে দিল।

আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া ম্যাচটি তাই শুধু একটি জয় নয়। এটি ছিল ইতিহাসের পাশে দাঁড়ানোর রাত। মেসি ক্লোসের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। এখন পুরো ফুটবলবিশ্ব অপেক্ষা করছে, কখন তিনি এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com