রোনালদোর পাশে থাকতে পারা সম্মানের বললেন মেসি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৪৬ বার

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব ফুটবল বহু কিংবদন্তির গল্প জানে। কিন্তু কিছু গল্প সময়কে ছাড়িয়ে যায়। লিওনেল মেসির গল্প তেমনই এক গল্প। বয়স, চাপ, প্রত্যাশা আর রেকর্ডের ভার পেরিয়ে তিনি আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে আলো ছড়ালেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে মেসি শুধু আর্জেন্টিনাকে বড় জয় এনে দেননি। তিনি নিজেকেও নিয়ে গেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরও উঁচু আসনে।

কানসাস সিটিতে গ্রুপ জে-র ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। তিনটি গোলই করেন মেসি। এটি বিশ্বকাপে তার প্রথম হ্যাটট্রিক। এই তিন গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬। ফলে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

এই মাইলফলকের পথে মেসি ছাড়িয়ে গেছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে। বিশ্বকাপে রোনালদোর গোল ১৫টি। বহু বছর ধরে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন হিসেবে আলোচিত। সেই রোনালদোর নামের পাশে, এমনকি তার ওপরে নিজের নাম দেখতে পারা মেসির কাছে বড় সম্মানের বিষয়।

ম্যাচ শেষে রেকর্ড স্পর্শ করার অনুভূতি জানাতে গিয়ে মেসি আবেগী প্রতিক্রিয়া দেন বলে জানা গেছে। তিনি বলেন, এত বড় বড় কিংবদন্তির সঙ্গে একই তালিকায় থাকতে পারা তার জন্য বিরাট সম্মান। বিশেষ করে রোনালদো নাজারিওর মতো একজন ফুটবলারের পাশে নিজের নাম দেখতে পাওয়া সত্যিই গর্বের।

রোনালদোকে নিয়ে মেসির শ্রদ্ধার কথা নতুন নয়। ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই জানেন, নব্বই দশকের শেষভাগ ও দুই হাজারের শুরুর সময় রোনালদো ছিলেন আক্রমণভাগের এক বিস্ময়। তার গতি, ড্রিবলিং, ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে গোল করার ক্ষমতা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মেসিও ছোটবেলায় রোনালদোর খেলা দেখে মুগ্ধ হতেন বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন।

মেসির ভাষায়, রোনালদো সর্বকালের সেরাদের একজন। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় রোনালদোর মতো খেলোয়াড় এক নম্বরে নেই, এটিই বলে দেয় এই আসরের ইতিহাস কত সমৃদ্ধ। এখানে খেলেছেন পেলে, জার্ড মুলার, জুস্ত ফন্তেইন, মিরোস্লাভ ক্লোসে, রোনালদো, মেসি, কিলিয়ান এমবাপে মতো অসাধারণ ফুটবলার। তাই এই তালিকার প্রতিটি নামই ফুটবল ইতিহাসের বড় অধ্যায়।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসির পারফরম্যান্স ছিল এক কথায় নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। তিনি শুধু গোল করেননি। আক্রমণ সাজিয়েছেন। সতীর্থদের সঙ্গে জায়গা বদল করেছেন। মাঝমাঠে নেমে বল নিয়েছেন। আবার বক্সে ঢুকে শেষ আঘাত করেছেন। বয়স ৩৮ হলেও তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি এখনো অসাধারণ। কখন পাস দিতে হবে, কখন শট নিতে হবে, কখন খেলা ধীর করতে হবে, তিনি যেন সব আগেই বুঝে ফেলেন।

প্রথম গোলটি আর্জেন্টিনাকে স্বস্তি দেয়। দ্বিতীয় গোলটি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করে। আর তৃতীয় গোলটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের মুহূর্ত। হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামে উপস্থিত আর্জেন্টাইন সমর্থকরা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। মেসির সতীর্থরাও তাকে ঘিরে ধরেন। তারা জানতেন, তারা শুধু একটি গোল উদযাপন করছেন না। তারা বিশ্বকাপ ইতিহাসের একটি বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছেন।

এই ম্যাচে মেসির আরেকটি বিশেষ অর্জনও যুক্ত হয়েছে। আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড আগে থেকেই তার। এবার সবচেয়ে বেশি বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ডও তার নামের পাশে যুক্ত হলো। এক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারে এমন দুই প্রান্ত ছুঁয়ে ফেলা সহজ নয়। এটি দীর্ঘ সময় ধরে একই মান ধরে রাখার প্রমাণ।

২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন এক তরুণ প্রতিভা। সেই আসরে তিনি ১ গোল করেন। ২০১০ সালে গোল না পেলেও আর্জেন্টিনার আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। ২০১৪ সালে ৪ গোল করে দলকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। ২০১৮ সালে করেন ১ গোল। ২০২২ সালে কাতারে ৭ গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতান। আর ২০২৬ সালে প্রথম ম্যাচেই ৩ গোল করে পৌঁছে গেলেন ১৬ গোলে।

এখন তার সামনে একক রেকর্ডের হাতছানি। আর একটি গোল করলেই তিনি ক্লোসেকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন। ফুটবল বিশ্ব তাই এখন অপেক্ষায়। অস্ট্রিয়া কিংবা জর্ডানের বিপক্ষে পরের ম্যাচেই কি সেই ইতিহাস লেখা হবে? নাকি আরও বড় কোনো ম্যাচের জন্য রেকর্ডটি জমিয়ে রাখবেন মেসি?

তবে মেসির কাছে রেকর্ড কখনো একমাত্র লক্ষ্য নয়। ম্যাচের পর তিনি ফুটবলের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও তুলে ধরেন বলে জানা গেছে। তিনি বলেন, তিনি এখনো ফুটবল খেলতে ভালোবাসেন। ছোটবেলা থেকেই এই খেলাই তার জীবন। তিনি যখন নিজেকে ভালো অবস্থায় অনুভব করেন, তখন মাঠে নিজের সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফুটবল এখনো তাকে আগের মতোই আনন্দ দেয়।

এই কথাগুলো মেসির ক্যারিয়ারের বড় সত্য তুলে ধরে। তিনি শুধু রেকর্ডের জন্য খেলেন না। তিনি খেলেন আনন্দের জন্য। দলের জন্য। দেশের জন্য। এই কারণেই হয়তো এত দীর্ঘ সময় পরও তার খেলায় ক্লান্তির ছাপ কম। বরং বড় মঞ্চে তিনি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।

আর্জেন্টিনার জন্য এই জয় বড় বার্তা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেছে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে। প্রথম ম্যাচেই ৩-০ গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। তার ওপর মেসির হ্যাটট্রিক দলকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করবে। কোচ লিওনেল স্কালোনির দল জানে, মেসি ভালো থাকলে আর্জেন্টিনার পথ অনেক সহজ হয়ে যায়।

তবে সামনে পথ কঠিন। বিশ্বকাপ দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। এক ম্যাচের জাদু যথেষ্ট নয়। ধারাবাহিকতা দরকার। ফিটনেস দরকার। চাপ সামলানোর ক্ষমতা দরকার। মেসির বয়স এখন ৩৮। তাই আর্জেন্টিনাকে তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার খেলা দেখে বোঝা গেল, তিনি এখনো সবচেয়ে বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়তে পারেন।

রোনালদো নাজারিওকে ছাড়িয়ে ক্লোসের পাশে পৌঁছানো মেসির জন্য শুধু সংখ্যার অর্জন নয়। এটি ফুটবল ইতিহাসে প্রজন্মের সংযোগ। রোনালদো ছিলেন এক সময়ের বিস্ময়। ক্লোসে ছিলেন বিশ্বকাপের ধারাবাহিক গোলমেশিন। আর মেসি সেই তালিকায় যোগ করেছেন শিল্প, বুদ্ধি ও দীর্ঘায়ুর এক অসাধারণ মিশ্রণ।

ফুটবল অনেক সময় বিতর্ক তৈরি করে। কে সেরা, কে বড়, কে বেশি প্রভাবশালী। কিন্তু কিছু মুহূর্তে বিতর্ক থেমে যায়। তখন শুধু দেখা যায়, একজন খেলোয়াড় ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কানসাস সিটির রাত ছিল তেমনই এক রাত। মেসি গোল করলেন। রেকর্ড ছুঁলেন। রোনালদোর প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন। আর ফুটবলপ্রেমীদের মনে করিয়ে দিলেন, কিংবদন্তিরা একে অন্যকে ছোট করেন না। তারা ইতিহাসকে আরও বড় করেন।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির হ্যাটট্রিক তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয় নয়। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে শ্রদ্ধা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মহত্ত্বের এক সুন্দর অধ্যায়। এখন পুরো ফুটবলবিশ্ব তাকিয়ে আছে তার পরের গোলের দিকে। কারণ সেই এক গোলই মেসিকে এককভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা বানিয়ে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com