২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেই জর্ডানকে হারাল অস্ট্রিয়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৪৬ বার

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরতে অস্ট্রিয়ার অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৮ বছর। শেষবার ১৯৯৮ সালে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে খেলেছিল তারা। এরপর একে একে কেটে গেছে পাঁচটি বিশ্বকাপ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই জয়ের স্বাদ পেল ইউরোপের দলটি। গ্রুপ জে-র উদ্বোধনী ম্যাচে অভিষিক্ত জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের অভিযান শুরু করল অস্ট্রিয়া।

সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল আবেগ, চাপ ও প্রত্যাশায় ভরা। অস্ট্রিয়ার জন্য এটি ছিল ফিরে আসার ম্যাচ। আর জর্ডানের জন্য ছিল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। একদিকে দীর্ঘ বিরতির পর ফেরা অভিজ্ঞ ইউরোপীয় দল। অন্যদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলা এক সাহসী এশীয় দল। তাই স্কোরলাইন যতই অস্ট্রিয়ার পক্ষে থাকুক, ম্যাচের গল্প ছিল আরও বড়।

প্রথমার্ধে অস্ট্রিয়া বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল। তারা ধীরে ধীরে আক্রমণ গড়ে তোলে। মাঝমাঠে মার্সেল সাবিতজার, কনরাড লাইমার ও নিকোলাস সাইভাল্ড খেলায় গতি আনেন। আক্রমণে রোমানো শ্মিড শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন। ম্যাচের ২০ মিনিটে সেই শ্মিডই অস্ট্রিয়াকে এগিয়ে দেন। দূরপাল্লার শক্তিশালী শটে তিনি জর্ডানের গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন। গোলের পর অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়দের চোখেমুখে ছিল স্বস্তি। কারণ বিশ্বকাপে দীর্ঘ বিরতির পর প্রথম গোল সব সময়ই বিশেষ।

জর্ডান অবশ্য গোল খেয়ে ভেঙে পড়েনি। তারা দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে। মুসা আল-তামারি ও আলি ওলওয়ান আক্রমণে কয়েকবার গতি তৈরি করেন। তবে প্রথমার্ধে অস্ট্রিয়ার রক্ষণ তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। অস্ট্রিয়ার অভিজ্ঞ ডিফেন্স বল ক্লিয়ার করে চাপ সামলায়। প্রথমার্ধ শেষ হয় অস্ট্রিয়ার ১-০ গোলের লিড নিয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের ছবি বদলে যায়। জর্ডান আরও সাহসী হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপে প্রথমবার খেললেও তাদের শরীরী ভাষায় ভয় ছিল না। বরং গোলের জন্য তারা এগিয়ে আসে। সেই চেষ্টার ফল মেলে ৫০ মিনিটে। আলি ওলওয়ান গোল করে জর্ডানকে সমতায় ফেরান। বিশ্বকাপে জর্ডানের প্রথম ম্যাচে এই গোল দেশটির ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা পাবে। গোলের পর জর্ডান সমর্থকদের উল্লাসে স্টেডিয়ামের একাংশ কেঁপে ওঠে।

সমতা ফেরার পর কিছু সময় অস্ট্রিয়া চাপের মধ্যে পড়ে। জর্ডান তখন আত্মবিশ্বাসী। তাদের পাসিং দ্রুত হয়। আক্রমণে গতি বাড়ে। অস্ট্রিয়ার কোচ দলকে আবার সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার মার্কো আরনাউতোভিচকে মাঠে নামানো হয়। তিনি নামার পর অস্ট্রিয়ার আক্রমণে নতুন চাপ তৈরি হয়।

৬৯ মিনিটে অস্ট্রিয়া ভেবেছিল তারা আবার এগিয়ে গেছে। আরনাউতোভিচ বল জালে পাঠান। কিন্তু VAR পর্যালোচনার পর গোলটি বাতিল হয়। কারণ গোলের আগে সতীর্থ স্টেফান পসচের হাতে বল লাগে। সেই মুহূর্তে অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়দের মধ্যে হতাশা দেখা যায়। অন্যদিকে জর্ডান নতুন করে উজ্জীবিত হয়। তবে এই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

৭৬ মিনিটে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। মার্সেল সাবিতজারের কর্নার থেকে আসা বল জর্ডানের ইয়াজান আল-আরবের গায়ে লেগে জালে যায়। আত্মঘাতী গোলের মাধ্যমে অস্ট্রিয়া আবার ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। জর্ডানের জন্য এটি ছিল কঠিন মুহূর্ত। সমতা ফেরানোর পর তারা ম্যাচে ভালোভাবেই ফিরেছিল। কিন্তু একটি ভুল তাদের আবার পিছিয়ে দেয়।

শেষ দিকে জর্ডান মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠে। তবে অস্ট্রিয়া তখন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দিকে বেশি মন দেয়। তারা বল ধরে রাখে এবং সময় ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হয়। জর্ডান আক্রমণ বাড়ালে রক্ষণে কিছু ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অস্ট্রিয়া শেষ দিকে আরও চাপ তৈরি করে।

যোগ করা সময়ে অস্ট্রিয়া পেনাল্টি পায়। জর্ডানের সালিম ওবেইদের হ্যান্ডবলের কারণে রেফারি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। মার্কো আরনাউতোভিচ স্পটকিক থেকে গোল করে অস্ট্রিয়ার জয় নিশ্চিত করেন। স্কোরলাইন তখন ৩-১। শেষ বাঁশি বাজতেই অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়রা স্বস্তির হাসি নিয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা দলের জন্য এর চেয়ে ভালো শুরু আর কী হতে পারত!

এই জয়ের পেছনে অস্ট্রিয়ার অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রেখেছে। ম্যাচে তারা সব সময় নিখুঁত ছিল না। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জর্ডানের চাপ সামলাতে তাদের কষ্ট হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তারা ধৈর্য হারায়নি। VAR-এ গোল বাতিলের ধাক্কা সামলে আবার এগিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা, সেট-পিস এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাদের জয় এনে দিয়েছে।

জর্ডান ম্যাচ হারলেও মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়তে পারে। প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে তারা ভয় পায়নি। পিছিয়ে পড়ার পরও সমতায় ফিরেছে। আলি ওলওয়ানের গোল দেশটির ফুটবল ইতিহাসের বড় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। জর্ডানের সমর্থকদের জন্য দিনটি শুধু পরাজয়ের নয়। এটি বিশ্বকাপে তাদের যাত্রার শুরু। ছোট ফুটবল ইতিহাসের একটি দেশ বড় মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে।

মাঠের বাইরে জর্ডান সমর্থকদের আবেগও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক সমর্থক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ম্যাচ দেখতে এসেছেন। লাল পতাকা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং দেশের নাম লেখা জার্সি পরে তারা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন। তাদের জন্য বিশ্বকাপের এই ম্যাচ ছিল গর্বের দিন। ফল খারাপ হলেও তারা দলের লড়াই দেখে আশাবাদী হতে পারেন।

অস্ট্রিয়ার জন্য সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় পরীক্ষা। নিজেদের পরের ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণকে আরও সংগঠিত হতে হবে। জর্ডানের বিপক্ষে জয় আত্মবিশ্বাস দেবে। তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একই ভুল করলে মূল্য দিতে হতে পারে।

অন্যদিকে জর্ডানের পরের ম্যাচ আলজেরিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচ তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপে টিকে থাকতে হলে পয়েন্ট দরকার। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তারা যে লড়াই দেখিয়েছে, সেটি ধরে রাখতে পারলে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ভালো ফলের আশা করা যায়। তবে রক্ষণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। আত্মঘাতী গোল ও শেষ মুহূর্তের হ্যান্ডবল তাদের বড় শিক্ষা দেবে।

গ্রুপ জে-তে আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান রয়েছে। তাই প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচ জিতে অস্ট্রিয়া তিন পয়েন্ট পেল। এতে তাদের পরের রাউন্ডে ওঠার আশা শুরুতেই শক্ত হলো। তবে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচের জয় কখনো নিশ্চয়তা দেয় না। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।

তবু অস্ট্রিয়ার কাছে এই জয় বিশেষ। কারণ এটি শুধু তিন পয়েন্ট নয়। এটি ২৮ বছরের অপেক্ষার শেষের আনন্দ। এটি প্রমাণ করে, দীর্ঘ বিরতির পর ফিরেও তারা প্রতিযোগিতায় নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারে। রোমানো শ্মিডের প্রথম গোল, আলি ওলওয়ানের ঐতিহাসিক সমতা, ইয়াজান আল-আরবের আত্মঘাতী গোল এবং আরনাউতোভিচের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি মিলিয়ে ম্যাচটি হয়ে রইল নাটকীয় এক বিশ্বকাপ গল্প।

সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামের এই রাত অস্ট্রিয়ার ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তারা ফিরেছে। ফিরেই জিতেছে। আর বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথে নিজেদের প্রথম বার্তা দিয়েছে স্পষ্টভাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত