নিমসার বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে উত্তেজনা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ৭২ বার

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নিমসার কাঁচাবাজারকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁচাবাজার হিসেবে পরিচিত এই বাজারে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলে খাজনা ও টোলের নামে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই বাজারে প্রতিদিন হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটে। কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি ও নিত্যপণ্যের বিশাল এই হাটে দৈনিক কোটি টাকার লেনদেন হলেও অভিযোগ অনুযায়ী, এর একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অবৈধ খাজনা ও চাঁদাবাজির পকেটে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বাজারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার মতো চাঁদা আদায় করা হয়, যা মাস শেষে কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

স্থানীয় প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য নিমসার বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকায়। মোকাম ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সফিকুর রহমান ভূঁইয়া সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পান। পরে ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ৯ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি পরিশোধের নির্দেশও দেওয়া হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ইজারা ও বৈধ টোল আদায়ের আড়ালে চলছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়। বড় ট্রাক বাজারে প্রবেশ করলে এক হাজার পাঁচশ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, কেনাবেচার প্রতিটি ধাপে আলাদা আলাদা খাজনা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।

বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এখানে শুধু বিক্রির সময় নয়, কেনার সময়ও খাজনা দিতে হয়। ধনিয়া পাতা, কচুর লতি, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর কেজি ভিত্তিতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

একজন তরমুজ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, এক লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করলে আট হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। সরকারি জায়গা হওয়া সত্ত্বেও এভাবে বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়, না হলে পণ্য খালাসে বাধা দেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও পরে আবারও সেই জায়গা দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জড়িত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতের কিছু নেতাকর্মীর নামও এ প্রসঙ্গে উঠে এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব দখলকৃত স্থানে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হয় এবং দোকানভিত্তিক ভাড়ার নামে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়। কেউ পাঁচ লাখ টাকার বিক্রি করলে তার কাছ থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ইজারাদার সফিকুর রহমান ভূঁইয়া দাবি করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ীই খাজনা আদায় করা হচ্ছে এবং বাজারের পণ্যমূল্যের ওপর ভিত্তি করেই টোল নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে অভিযোগ পাওয়া একাধিক রাজনৈতিক কর্মী দাবি করেছেন, তারা কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নন এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অতীতেও চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে আবারও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, নতুন করে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, বাজারে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনও জানিয়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ করতে নতুন করে নজরদারি বাড়ানো হবে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও কৃষকরা বলছেন, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। তাদের দাবি, নিমসার বাজারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বচ্ছ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

সব মিলিয়ে নিমসার কাঁচাবাজার ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন সবার নজর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আনে তা সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com