প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পানিসম্পদমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় নেতা আনোয়ার হোসেন টানা ২০ দিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে জামিন না হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামীকাল রোববার লক্ষ্মীপুর জেলা জজ আদালতে তার জামিন শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আনোয়ার হোসেন জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মোহাম্মদ আলীর ছেলে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গত ৩০ মে রাতে নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে মারধরের অভিযোগ তুলে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তার পরিবার ও দলীয় সহকর্মীরা। এরপর তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় এবং পরদিন আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার পরপরই এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই আনোয়ার হোসেনকে টার্গেট করা হয়েছে। অন্যদিকে মামলার বাদীপক্ষ বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচারের কারণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ মে রায়পুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন সোনাপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে নিয়ে ফেসবুকে মানহানিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইন এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় আনোয়ার হোসেনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি তার দুই ভাই ইমন হোসেন ও রুবেল হোসেনসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা চারজনকেও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট প্রকাশের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আনোয়ার ও তার সহযোগীরা বাদীপক্ষের ওপর হামলা চালান। এমনকি বাদীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে এনসিপি। দলটির নেতারা বলছেন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিরোধী মতের কর্মীদের হয়রানির জন্য এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের দাবি, আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তারের আগে স্থানীয়ভাবে মারধর করা হয়েছে এবং তার বাড়িতেও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, সোনাপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ী বাজার এলাকায় আনোয়ারকে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে আহত অবস্থায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অনুসারীরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে এবং ঘটনার বিচার দাবি করেন।
গ্রেপ্তারের পর তদন্তের স্বার্থে পুলিশ আদালতে রিমান্ড আবেদন করে। তবে আদালত সরাসরি রিমান্ড মঞ্জুর না করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। গত ৪ জুন লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল হক একদিনের জন্য জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রায়পুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহবুব আলম কারাগারে গিয়ে আনোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এনসিপির লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যসচিব আলমগীর হোসাইন অভিযোগ করেন, আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের আগে বিপুলসংখ্যক লোক নিয়ে আনোয়ারের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এরপর তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক মতভেদের কারণে একজন নেতাকে দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসারেই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি আব্দুল আহাদ শাকিল পাটোয়ারী জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধান আসামি আনোয়ার হোসেনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মামলার আরেক আসামি ইমন হোসেনকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছিল। তবে পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি তা জমা দিতে পারেননি। এ পরিস্থিতিতে বিদেশে যাত্রা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে। এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ—দুই বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আনোয়ার হোসেনের মামলাটিও সেই বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
এদিকে আগামীকালের জামিন শুনানিকে ঘিরে রায়পুর ও লক্ষ্মীপুরের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে উভয় পক্ষ। জামিন মঞ্জুর হলে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নতুন মোড় নিতে পারে। আর জামিন না হলে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে বলে আইন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।