রাজশাহীতে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত ১, সড়ক অবরোধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৬৩ বার
বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত

প্রকাশ: ০৮ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ঈদের নামাজের ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আলাউদ্দিন নামে জামায়াতের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষুব্ধ কর্মীরা রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।

শনিবার রাত প্রায় ৮টার দিকে মোহনপুর উপজেলার সাঁকোয়া গ্রামে অবস্থিত ঈদগাহ বড় মসজিদ এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আসন্ন ঈদের নামাজে কে ইমামতি করবেন তা নির্ধারণের জন্য ওই রাতে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এতে এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। সভায় স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দুই পক্ষ নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে ঈদের নামাজের ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি তুললে শুরু হয় উত্তপ্ত বিতর্ক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই আলোচনা চলছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। পরে তা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের সময় লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া আলাউদ্দিনকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে জামায়াতের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়।

নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা জিএএম আব্দুল আওয়াল। তিনি বলেন, একটি সাধারণ ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এমন সহিংস ঘটনা ঘটবে তা কেউ কল্পনাও করেননি। তার দাবি, সংঘর্ষে জামায়াতের কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে আলাউদ্দিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। বিক্ষোভকারীরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে যায় এবং যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।

বিক্ষোভ চলাকালে একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করে।

এ বিষয়ে মোহনপুর উপজেলা থানার অফিসার ইনচার্জ এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় একজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সম্ভাব্য কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছেন, ঈদের নামাজের মতো একটি ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিভক্তি এতটা তীব্র হয়ে উঠবে তা তারা আগে ভাবেননি। তাদের মতে, গ্রামের সামাজিক ও ধর্মীয় ঐক্য বজায় রাখতে সবাইকে সংযম দেখানো প্রয়োজন ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়কে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা অনেক সময় এমন সংঘাতের জন্ম দেয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মসজিদ, ঈদগাহ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব মাঝে মধ্যেই রাজনৈতিক রূপ নেয়। ফলে ছোট একটি বিষয়ও বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

এদিকে নিহত আলাউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বসবাস করতেন এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বর্তমানে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সড়ক থেকে অবরোধ সরিয়ে যান চলাচল পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এলাকায় উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত না হওয়ায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সব মিলিয়ে রাজশাহীর মোহনপুরে ঘটে যাওয়া এই সংঘর্ষ স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একটি ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমন সহিংসতা শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; বরং এটি স্থানীয় সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন অনেকেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত