মেটার এআই পরিকল্পনা: ২০ শতাংশ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
মেটার এআই পরিকল্পনা: ২০ শতাংশ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা আবারও বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি হিসেবে পরিচিত মেটার বর্তমানে প্রায় ৭৯,০০০ কর্মী কাজ করছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির মোট কর্মীর প্রায় ২০ শতাংশ বা তারও বেশি ছাঁটাই হতে পারে। এই হিসেবে প্রায় ১৬,০০০ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন।

মেটার এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে কোম্পানির বিনিয়োগ। মার্ক জুকারবার্গ সম্প্রতি জানান, ২০২৮ সালের মধ্যে তারা এআই খাতে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছেন। এ ধরনের বিশাল বিনিয়োগের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এবং কোম্পানিকে আরও ছোট, দক্ষ ও কার্যকর রাখতে তারা কর্মী সংখ্যা হ্রাসের পথে এগোতে চাইছে। জুকারবার্গের মতে, আগে কোনো কাজ সম্পন্ন করতে বৃহৎ টিমের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এখন এক দক্ষ কর্মীই এআই প্রযুক্তির সহায়তায় সেই কাজ করতে সক্ষম।

মেটার মুখপাত্র অ্যান্ডি স্টোন অবশ্য এই খবরকে অনুমাননির্ভর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “কোম্পানির কর্মকর্তাদের খরচ কমানোর পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি।” এর আগে ২০২২ এবং ২০২৩ সালে মেটা কয়েক দফায় মোট প্রায় ২১,০০০ কর্মী ছাঁটাই করেছিল। ফলে এআই-ভিত্তিক কার্যক্রম ও খরচের চাপ নতুনভাবে কোম্পানিকে পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করছে।

শুধু মেটাই নয়, প্রযুক্তি জগতের অন্যান্য বড় কোম্পানিও এআইকে কেন্দ্র করে কর্মী সংখ্যা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যামাজন তাদের ১৬,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, আর ফিনটেক জায়ান্ট ব্লক তাদের অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করবে। এআই প্রযুক্তি ক্রমবর্ধমান হওয়ায় বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মানুষের চেয়ে এআই-এর ওপর বেশি নির্ভর করতে চাচ্ছে।

বিশ্লেষকের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎকে আরও স্বয়ংক্রিয় এবং এআই নির্ভর করার দিকে এগোচ্ছে। যদিও কোম্পানি খরচ কমানো ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য দেখাচ্ছে, কর্মীরা ব্যক্তিগত ও আর্থিকভাবে এই পরিবর্তনের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই-ভিত্তিক পরিবর্তন মানব সম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, চাকরির নিরাপত্তা কমাবে এবং কাজের ধরন পরিবর্তন করবে।

কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি মেটা অন্যান্য নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে। যেমন এআই-চালিত চ্যাটবট, ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ, এবং ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (VR) ও অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR) প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন। কোম্পানির উদ্দেশ্য, কম সংখ্যক কর্মী দিয়ে একই বা বেশি কার্যক্ষমতা অর্জন করা। তবে এ ধরনের পরিবর্তন প্রযুক্তি কর্মীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, যেখানে তারা নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেটার এই সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি জগতের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার প্রতিফলন। এআই প্রযুক্তি যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তত বেশি প্রতিষ্ঠান ছোট ও দক্ষ কর্মী টিমের ওপর নির্ভর করছে। ফলে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে। চাকরি হারানো কর্মীরা অন্য শিল্পে বা নতুন দক্ষতার জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য হবেন।

মানবিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৬,০০০ পরিবার সরাসরি এই সিদ্ধান্তের প্রভাব অনুভব করতে পারে। যাদের চাকরি চলে যাবে, তারা আর্থিক এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বেন। বিশেষজ্ঞরা এই সময় কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পুনঃপ্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন।

মেটার আগের ছাঁটাই এবং এআই বিনিয়োগের ইতিহাসও এই প্রবণতার প্রমাণ দেয়। ২০২২-২৩ সালের সময়কালেও কোম্পানি প্রায় ২১,০০০ কর্মী ছাঁটাই করেছিল। নতুন ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। প্রযুক্তি বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি এখন মানুষের চেয়ে এআই-এর ওপর বেশি নির্ভর করতে চাইছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেবল খরচ কমানোর জন্য নয়, বরং কোম্পানিকে ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকার উপযোগী করে তুলতে করা হচ্ছে। তবে কর্মীদের জন্য এটি অস্থিরতার কারণ হিসেবে কাজ করছে। শ্রমিক ও এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ভারসাম্য রক্ষা না করলে কর্মক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাবও পড়তে পারে।

এছাড়া, প্রযুক্তি জগতের অন্যান্য বড় কোম্পানির উদাহরণ যেমন অ্যামাজন ও ব্লক দেখাচ্ছে, এআই-ভিত্তিক পুনর্গঠন একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। মেটার মতো কোম্পানিগুলো এআই-নির্ভর কার্যক্রম বৃদ্ধি করে ছোট ও দক্ষ টিম গঠনের মাধ্যমে খরচ কমাতে চাইছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি কর্মীদের কাজের ধরন ও নিরাপত্তা দুইয়েরই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।

মেটার এই সিদ্ধান্ত এবং এআই বিনিয়োগের তত্ত্ববিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি বিশ্বের ভবিষ্যৎ এখন মানুষের চেয়ে এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। চাকরি হারানো বা কমানো কর্মীদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ ও নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়োপযোগী ও মানবিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত