সংবিধান বদলের হুঁশিয়ারি পাটওয়ারীর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
সংবিধান বদলের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁদপুরে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিল ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। বর্তমান সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই সংবিধান বাতিলের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন তারা। তার এমন বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে তেমনি সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গটিকেও আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

বুধবার চাঁদপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এনসিপির আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশে যে পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে সেটি প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান থেকেই সেই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। তার মতে, বর্তমান সংবিধান দেশের বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এর মধ্যে মৌলিক কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

পাটওয়ারী বলেন, সংবিধান একটি রাষ্ট্রের মূল কাঠামো নির্ধারণ করে দেয় এবং সেই কাঠামো যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত না করে তবে তা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সংবিধান দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং বিভিন্ন সময়ে এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তার বক্তব্যে তিনি সংবিধানকে কেন্দ্র করে অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে বহু রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং সেই সময়ে সংবিধান তাদের সুরক্ষা দিতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, একটি কার্যকর ও জনগণমুখী সংবিধান গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো উন্নয়ন বা সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়া হয় তবে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন। তার ভাষায়, প্রয়োজন হলে বর্তমান সংবিধান বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এই মন্তব্যকে অনেকেই একটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।

সমসাময়িক প্রশাসনিক নিয়োগ ও কোটা পদ্ধতি নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তার দাবি অনুযায়ী, দেশে এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটাভিত্তিক নিয়োগ প্রাধান্য পাচ্ছে এবং এতে যোগ্যতার মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে যা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক। তার ভাষায়, যারা দায়িত্ব পালনের যোগ্য নয় তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পাটওয়ারী আরও বলেন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই জনগণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে কাজ করছেন। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য বলে তিনি মত দেন।

চাঁদপুরের স্থানীয় সমস্যা নিয়েও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পায় নদী ও পরিবেশ বিষয়ক ইস্যু। তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। নদীভাঙনে মানুষ তাদের বসতভিটা হারাচ্ছে এবং জীবিকা সংকটে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি উল্লেখ করেন, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই চক্রকে প্রতিহত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

স্থানীয় উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাঁদপুর থেকে বিভিন্ন সময়ে অনেক মন্ত্রী নির্বাচিত হলেও জেলার সার্বিক উন্নয়ন প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। শিক্ষা, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

একই সঙ্গে তিনি শিক্ষা খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, একটি অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য মানসম্মত শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও চাঁদপুরে সেই মান বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না।

রাজনৈতিক প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাস উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ইফতার মাহফিলে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। তাদের বক্তব্যেও দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়।

সামগ্রিকভাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে সংবিধান সংস্কার, সুশাসন এবং পরিবেশ রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তার মন্তব্যগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নও সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান নিয়ে এমন আলোচনা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং তা কীভাবে করা যেতে পারে তা নিয়ে এখনই স্পষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকলেও বিষয়টি নিয়ে জনমত গঠনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে তার বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত