প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার গুঞ্জনের মধ্যেই ক্রেতাদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প মালিক সমিতি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অযথা অতিরিক্ত জ্বালানি কিনে মজুত করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের কাছে তাদের আবেদন, প্রয়োজনের বাইরে জ্বালানি সংগ্রহ না করে স্বাভাবিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে পেট্রল পাম্প মালিক সমিতি জানায়, দেশের জ্বালানি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবুও গুজব বা আতঙ্কের কারণে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে পরিবহন খাত এবং শিল্পকারখানায়।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু একই দিনে জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বা কালোবাজারি মজুতের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সত্ত্বেও সরকার সরবরাহ চেইন সচল রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সম্প্রতি জরুরি ভিত্তিতে তিন লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বোঝা যায়, সরকার সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই ডিজেল কেনা হবে। এর মধ্যে এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আসবে এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থেকে এবং বাকি দুই লাখ মেট্রিক টন সরবরাহ করবে সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের আগাম প্রস্তুতি জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে স্থিতিশীল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকারের এই পদক্ষেপ বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা শুরু করে, তাহলে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে প্রকৃত ভোক্তারা সমস্যায় পড়বেন। তাই তারা বারবার সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, গুজবে কান না দিয়ে সরকারি তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
দেশের জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেল শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য নয়, বরং কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতে সামান্য অস্থিরতাও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সেই বিবেচনায় বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অনেক দেশেই জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, পর্যাপ্ত মজুত এবং নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা হচ্ছে।
সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয় মজুত করলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই চাপ সৃষ্টি করে। তাই দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও গুজব ও অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির এই আহ্বান। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তৎপরতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং সংযমই পারে জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে এবং অপ্রত্যাশিত সংকট এড়াতে।