প্রকাশঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নৌ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের কঠোর নির্দেশনার পরও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটগুলোতে সেই নির্দেশ কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে—এমন উদ্বেগজনক চিত্র আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে যাত্রীসহ বাস ফেরিতে তোলা নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে সেই নিয়ম মানছেন না বাসচালক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরাও। এতে করে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যেই একাধিক প্রাণঘাতী ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়। সেই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, কোনো অবস্থাতেই যাত্রীসহ বাস ফেরিতে তোলা যাবে না। ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে শতভাগ যাত্রী নামিয়ে দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এই নির্দেশনার লক্ষ্য ছিল যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফেরি পারাপারে ঝুঁকি কমানো।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গত বুধবার পাটুরিয়া ঘাটে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, নির্দেশনার কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। বাসগুলোতে যাত্রী বহাল রেখেই ফেরিতে তোলা হচ্ছে। এতে করে সরকারের নির্দেশনা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিদর্শনের সময় একাধিক বাস—যেমন ঢাকা মেট্রোর বিভিন্ন নম্বরের যাত্রীবাহী বাস—রো-রো ফেরিতে উঠতে দেখা যায়, যেখানে যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ আসনে বসে ছিলেন। ফেরি ‘কেরামত আলী’ ও ‘শাহ মখদুম’-এ এমন দৃশ্য চোখে পড়ে, যা পুরো ব্যবস্থাপনার প্রতি প্রশ্ন তুলেছে। যাত্রীদের নামানো তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কোনো ধরনের তদারকি বা চাপ প্রয়োগেরও লক্ষণ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দায় এড়ানোর প্রবণতাও স্পষ্ট। বন্দর ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দাবি করেন, তারা নিয়ম অনুযায়ী তদারকি করছেন, তবে যাত্রীদের সচেতনতার অভাবে তাদের নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এই বক্তব্যে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব, সেখানে যাত্রীদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়াকে দায়িত্বহীনতা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে ফেরিঘাটে দায়িত্বে থাকা আরেক কর্মকর্তা জানান, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে যাত্রী নামানোর বিষয়টি তদারকি করেছেন এবং নির্দিষ্ট একজন ব্যবস্থাপককেও এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্রে সেই তদারকির কোনো কার্যকর ফল দেখা যায়নি। ঘাটে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানান, যাত্রী নামানোর বিষয়ে কোনো জোরালো উদ্যোগ চোখে পড়েনি, বরং সবকিছুই চলেছে আগের মতোই।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো যাত্রীদের নিরাপত্তা। ফেরিতে যাত্রীসহ বাস ওঠানো হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস যদি কোনো কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায় বা ফেরির ভারসাম্যে সমস্যা হয়, তাহলে যাত্রীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে প্রাণহানির আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে।
গত ২৫ মার্চের দৌলতদিয়া দুর্ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে সরাসরি নদীতে পড়ে যায়। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় ২৬ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া এই ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে।
এই দুর্ঘটনার পরপরই সরকার কঠোর নির্দেশনা জারি করলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না, সেটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হবে না।
যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক যাত্রীই সময় বাঁচাতে বা ভোগান্তি এড়াতে বাস থেকে নামতে চান না। কিন্তু এই সাময়িক সুবিধার পেছনে যে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে, তা অনেকেই উপলব্ধি করেন না। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া পরিবহন মালিক ও চালকদের মধ্যেও নিয়ম মানার প্রবণতা কম। দ্রুত পারাপারের জন্য তারা অনেক সময় ঝুঁকি নিয়েই যাত্রীসহ বাস ফেরিতে তুলছেন। এতে করে তারা যেমন নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন, তেমনি যাত্রীদের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
ফেরিঘাটগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল ও কঠোর নজরদারির অভাবও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য থাকলে কোনো নির্দেশনাই কার্যকর হয় না—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না, সেটিকে বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতন করতে প্রচার-প্রচারণাও জোরদার করতে হবে।
নদীপথে যাতায়াত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্বও বটে। প্রতিটি জীবনের মূল্য আছে, এবং সেই মূল্য রক্ষায় কোনো ধরনের অবহেলা বা শৈথিল্যের সুযোগ নেই।
যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে।