গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশে ধস দেখা দেওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে কয়েকটি গ্রামের শতাধিক পরিবার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি এবং তীব্র স্রোতের কারণে তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশে ফাটল ও ধসের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ছোট পরিসরে ক্ষয় দেখা গেলেও ধীরে ধীরে সেটি বিস্তৃত হতে শুরু করেছে। ফলে নদীর পাড়সংলগ্ন বসতবাড়ি, আবাদি জমি এবং বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, কয়েক বছর আগে নদীভাঙন রোধে নির্মিত তীররক্ষা বাঁধটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের নিরাপত্তা দিয়ে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি বাঁধের নিচের অংশে মাটি সরে যেতে শুরু করায় এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নদীর তীব্র স্রোত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
নদীতীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের মধ্যে ভাঙনের ভয় কাজ করে। এবারের ধস সেই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, সম্ভাব্য ভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়িই নয়, বিপুল পরিমাণ কৃষিজমিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যমুনা নদীর পাড়ের উর্বর জমিতে বিভিন্ন মৌসুমি ফসল চাষ করা হয়। বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এসব জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা ধসের প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, নদীর তলদেশে মাটির ক্ষয় এবং প্রবল স্রোতের চাপের কারণে বাঁধের অংশবিশেষ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেলে ধসের পরিমাণ বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সাঘাটা অঞ্চলে যমুনা নদীর ভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতেও নদীর আগ্রাসনে বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে নতুন করে ধসের ঘটনায় পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় টেকসই তীররক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো দুর্বল অংশ চিহ্নিত করে মেরামত করা গেলে বড় ধরনের ক্ষতি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হবে। একই সঙ্গে এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সাময়িক মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে যমুনা নদীর তীররক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছরই তাদের একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, সাঘাটায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ধসের ঘটনা নদীতীরবর্তী জনপদে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দ্রুত সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শত শত পরিবার, কৃষিজমি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।