ঢাবি চারুকলায় নববর্ষ শোভাযাত্রার প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০৫ বার
বাংলা নতুন বছর বরণে প্রস্তুত ঢাবির চারুকলা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পুরোনো জীর্ণতা, ক্লান্তি আর গ্লানিকে বিদায় জানিয়ে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করতে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে এখন উৎসবের আবহ। চারদিকে রং, তুলির টান আর শিল্পীদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে, যেখানে অংশ নিচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শিল্পপ্রেমীরা একসঙ্গে।

এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে কেবল নতুন বছরকে স্বাগত জানানোই নয়, বরং সমাজে ঐক্য, গণতান্ত্রিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে দিন-রাত চলছে নানা প্রস্তুতিমূলক কাজ। বাঁশ, কাঠ ও কাগজের কাঠামোতে তৈরি করা হচ্ছে বিশালাকৃতির শিল্পমোটিফ, যেগুলো রঙের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি এসব মোটিফ যেন শুধু শিল্প নয়, বরং একটি সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হয়ে উঠছে। কেউ রং তুলির আঁচড়ে প্রাণ দিচ্ছেন কাঠামোতে, কেউ আবার খুঁটিনাটি নকশায় ব্যস্ত, আবার কেউ তৈরি করছেন মুখোশ ও আলপনার নকশা।

জয়নুল গ্যালারির সামনে মাটির সরায় আলপনা আঁকা, মুখোশ তৈরি এবং লোকজ ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলার কাজ চলছে সমানতালে। একই সঙ্গে নিজেদের তৈরি শিল্পকর্ম বিক্রি করে শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহ করছেন শিক্ষার্থীরা। এতে যেমন প্রস্তুতি এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি উঠে আসছে তরুণ শিল্পীদের সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের গল্প।

এবারের শোভাযাত্রায় লোকজ ঐতিহ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট পাঁচটি প্রধান প্রতীকী মোটিফ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মোরগ, দোতারা, কাঠের হাতি, পায়রা ও টেপা ঘোড়া। প্রতিটি মোটিফের মাধ্যমে আলাদা আলাদা বার্তা প্রকাশ করা হবে। মোরগ নতুন দিনের সূচনা ও জাগরণের প্রতীক, দোতারা বাংলার সংগীত ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি, কাঠের হাতি শক্তি ও গৌরবের প্রতীক, পায়রা শান্তি ও সহাবস্থানের বার্তা বহন করে, আর টেপা ঘোড়া গতিময়তা ও অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ জানান, এই আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং বাংলার শেকড় ও ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের একটি সম্মিলিত প্রয়াস। তাঁর মতে, নববর্ষের এই আয়োজন সমাজের সমসাময়িক বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করে, যেখানে শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করা হয়। তিনি আরও বলেন, শোভাযাত্রার প্রতিটি প্রতীক নতুন জাগরণ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার বার্তা বহন করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের শোভাযাত্রা চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউ-টার্ন নিয়ে রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি প্রাঙ্গণ এবং দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলায় ফিরে শেষ হবে। সকাল ৮টা থেকে শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হবে এবং সকাল ৯টায় মূল শোভাযাত্রা শুরু হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রবেশপথগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীদের নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। শোভাযাত্রা চলাকালে অন্যান্য প্রবেশপথ বন্ধ থাকবে। পরিচয়পত্র বহন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে মুখোশ পরা, ব্যাগ বহন, ইংরেজি প্লাকার্ড ব্যবহার, বেলুন, ফেস্টুন ও আতশবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ক্যাম্পাসে সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম এবং অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোবাইল পাবলিক টয়লেটও বসানো হয়েছে, যাতে দর্শনার্থী ও অংশগ্রহণকারীদের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।

প্রশাসন জানিয়েছে, নববর্ষের দিন বিকাল ৫টার মধ্যে সব কার্যক্রম শেষ করতে হবে এবং এরপর ক্যাম্পাসে প্রবেশ বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তা বিবেচনায় ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যার পর থেকে স্টিকারবিহীন যানবাহনের প্রবেশও নিষিদ্ধ থাকবে এবং নববর্ষের দিন পুরো ক্যাম্পাসে যান চলাচল বন্ধ থাকবে।

এদিকে নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে আজ চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চারুকলার বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে লোকসংগীত, নৃত্য এবং বিভিন্ন শিল্পধারার পরিবেশনা থাকবে। পাশাপাশি ১৫ ও ১৬ এপ্রিল মঞ্চস্থ হবে ‘বাগদত্তা’ ও ‘দেবী সুলতানা’ শীর্ষক যাত্রাপালা, যা নববর্ষ উৎসবকে আরও বর্ণিল করে তুলবে।

সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এখন শুধু প্রস্তুতির ব্যস্ততা নয়, বরং এক ধরনের আবেগ, ঐতিহ্য আর সৃজনশীলতার মিলনমেলা। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন যেন নতুন বছরের আনন্দের পাশাপাশি সমাজে নতুন আশার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com