প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য আরেকটি গর্বের খবর নিয়ে হাজির হয়েছেন অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সংস্কৃতি ও শিল্পকে নতুন করে তুলে ধরার ধারাবাহিকতায় তার অভিনীত সিনেমা ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ জায়গা করে নিয়েছে ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আর্টকোর বিভাগে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অভিনেত্রী নিজেই, যা ইতোমধ্যে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। সেখানে একটি বাংলাদেশি সিনেমার নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বিশেষ করে আর্টকোর বিভাগের মতো একটি সৃজনশীল ও পরীক্ষাধর্মী শাখায় নির্বাচিত হওয়া সিনেমাটির শিল্পগুণ এবং বিষয়বস্তুর গভীরতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভাবনা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই অর্জন শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও শিকড়ের জয়। তিনি জানান, দেশের লোকজ ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া তার জন্য এক বিশাল সম্মানের বিষয়। ‘আমাদের শিকড় থেকে মস্কো পর্যন্ত’—এই কথাটির মধ্য দিয়েই তিনি তার অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করেছেন।
‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ সিনেমাটি মূলত বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য যাত্রাপালার বর্তমান অবস্থা এবং তার অবক্ষয়ের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত। একসময় গ্রামীণ বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে যাত্রাপালার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিনোদনের আগ্রাসনে সেই ঐতিহ্য ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। এই বাস্তবতাকেই সিনেমাটির মূল উপজীব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সিনেমার গল্পে ‘প্রিন্সেস’ নামের একটি চরিত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একজন আকর্ষণীয় নৃত্যশিল্পী, যিনি দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী মঞ্চে নিজের উপস্থিতি দিয়ে পুরো পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করেন। এই চরিত্রের মাধ্যমে বর্তমান সমাজে বিনোদনের ধরন এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একদিকে যেখানে ঐতিহ্যবাহী শিল্পরূপ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে বাণিজ্যিকতা এবং তাৎক্ষণিক বিনোদনের চাহিদা বাড়ছে—এই দ্বন্দ্বই সিনেমার মূল সুর।
পরিচালক আসিফ ইসলাম এই সিনেমার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কেবলমাত্র আধুনিকতার নামে যদি আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে যাই, তবে একসময় সেই শিকড় হারিয়ে যাবে চিরতরে। আর সেই হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি খুব সূক্ষ্ম হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর।
এই সিনেমায় ভাবনার পাশাপাশি আরও অভিনয় করেছেন অরবিন্দ মজুমদার, সতেজ চৌধুরী, মাহমুদ আলম, এ. কে. আজাদ সেতু, সালাউদ্দিন শেখ এবং জান্নাতুল বাকের খান। প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রে প্রাণবন্ত অভিনয় করেছেন বলে জানা গেছে, যা সিনেমাটির সামগ্রিক মানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে, যা দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে স্বাধীন ও বিকল্প ধারার সিনেমাগুলো এখন আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে নতুন নির্মাতারা যেমন উৎসাহ পাচ্ছেন, তেমনি পুরনো ধারার বাইরেও ভিন্নধর্মী গল্প বলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো একটি প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ শুধু একটি সিনেমা হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি প্রতিনিধি হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। এটি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, যাত্রাপালা এবং তার বর্তমান সংকট সম্পর্কে ধারণা দেবে।
এছাড়া এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ একটি চলচ্চিত্র যখন আন্তর্জাতিক উৎসবে স্বীকৃতি পায়, তখন সেটি দেশের অন্যান্য নির্মাতাদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
ভাবনার এই সাফল্য ব্যক্তিগতভাবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটি পুরো দেশের শিল্পী সমাজের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক গল্প, দক্ষ নির্মাণ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিতে পারে।
সব মিলিয়ে ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’-এর এই অর্জন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন অপেক্ষা, উৎসবে সিনেমাটির প্রদর্শনী এবং আন্তর্জাতিক দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়ার।