হেড ও নেক ক্যানসারে রেডিওথেরাপির অগ্রগতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
হেড ও নেক ক্যানসারে রেডিওথেরাপির অগ্রগতি

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে হেড ও নেক ক্যানসার বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মুখ, জিহ্বা, গলা, ল্যারিংস এবং ন্যাসোফ্যারিংসের মতো অঙ্গগুলোতে এই ক্যানসারের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক, জর্দা, পান-সুপারি ও ধূমপানের মতো অভ্যাস এই রোগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এখন এই ক্যানসারের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। বিশেষ করে রেডিওথেরাপি প্রযুক্তির উন্নয়ন রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রোগীদের জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে পুরনো পদ্ধতির রেডিওথেরাপির সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে দূর হয়েছে। আগে প্রচলিত রেডিওথেরাপিতে টিউমারের পাশাপাশি আশপাশের সুস্থ টিস্যুও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। এতে রোগীদের মুখ শুকিয়ে যাওয়া, খাবার গ্রহণে সমস্যা এবং কথা বলার জটিলতার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত। তবে বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছে।

বিশেষ করে ইনটেনসিটি মডুলেটেড রেডিওথেরাপি এবং ভলিউমেট্রিক মডুলেটেড আর্ক থেরাপি প্রযুক্তি ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমারের আকৃতি ও অবস্থান অনুযায়ী নির্দিষ্টভাবে রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা সম্ভব হলেও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন লালাগ্রন্থি, স্পাইনাল কর্ড এবং মুখগহ্বর অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকে।

এর পাশাপাশি ইমেজ গাইডেড রেডিওথেরাপি প্রযুক্তি চিকিৎসাকে আরও নির্ভুল করেছে। প্রতিটি চিকিৎসা সেশনের আগে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে রোগীর অবস্থান নিশ্চিত করা হয়, ফলে প্রতিবার সঠিক স্থানে রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। এতে চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং রোগ পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেড ও নেক ক্যানসারের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো অঙ্গ সংরক্ষণ। আগে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুখ বা কণ্ঠনালীর অংশ অপসারণ করতে হতো, যা রোগীর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক প্রভাব ফেলত। বর্তমানে আধুনিক কনকারেন্ট কেমোরেডিওথেরাপির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে সেই অঙ্গ অক্ষত রেখেই চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে। এটি রোগীর সামাজিক জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি।

তবে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক রেডিওথেরাপির সুবিধা এখনো সব রোগীর জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়। রাজধানী ও কিছু বড় শহর ছাড়া অনেক এলাকায় এই প্রযুক্তির সীমিত উপস্থিতি রয়েছে। ফলে অনেক রোগী প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সুসংগঠিত জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের মতে, ক্যানসার চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ করা এখন সময়ের দাবি। ঢাকা-কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে আধুনিক রেডিওথেরাপি ইউনিট স্থাপন করা হলে রোগীরা দ্রুত ও সহজে সেবা পেতে পারবেন।

এছাড়া চিকিৎসা খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেই যথেষ্ট নয়, বরং রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং টেকনোলজিস্টদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এতে চিকিৎসার মান আরও উন্নত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রেডিওথেরাপি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল চিকিৎসা পদ্ধতি হওয়ায় এখানে মাননিয়ন্ত্রণ বা কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ভুলও রোগীর জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়মিত মান যাচাই ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আধুনিক রেডিওথেরাপি অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য এটি কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা, স্বাস্থ্য বীমা এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হেড ও নেক ক্যানসারের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রোগী দেরিতে চিকিৎসা শুরু করায় জটিলতা বেড়ে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে রেডিওথেরাপির ফলাফল অনেক ভালো পাওয়া যায় এবং রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।

নতুন প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাইপোফ্র্যাকশনেশন, যেখানে কম সংখ্যক সেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায়। এটি রোগীর সময় ও খরচ দুই-ই কমায় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপও হ্রাস করে। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, আধুনিক রেডিওথেরাপি এখন ক্যানসার চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং রোগীদের জন্য নতুন আশার আলো। তবে এর পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, দক্ষ জনবল, আধুনিক অবকাঠামো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে হেড ও নেক ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে আধুনিক রেডিওথেরাপি বাংলাদেশে হাজারো রোগীর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত