মব সহিংসতায় শিক্ষকদের মৃত্যু-আতঙ্ক বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩৮ বার
মব সহিংসতায় শিক্ষকদের মৃত্যু-আতঙ্ক বাড়ছে

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়কে ঘিরে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে এক উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত মব সহিংসতার ঘটনায় একের পর এক শিক্ষক শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন মাসেই এ ধরনের ঘটনায় অন্তত ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচ শতাধিক শিক্ষক বিভিন্নভাবে আহত, অসুস্থ কিংবা মানসিক আঘাতে ভুগছেন। তাঁদের অনেকেই এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

এই পরিস্থিতি শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে কিছু ক্ষেত্রে সংগঠিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে করে শিক্ষকতা পেশার নিরাপত্তা এবং মর্যাদা—উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এ ধরনের একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে Habiganj জেলার তেলিয়াপাড়া শাহজাহানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমকে তাঁর নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ করে ১০ থেকে ১৫ জন বহিরাগত যুবক। অভিযোগ ওঠে, তারা মিথ্যা অপবাদ তুলে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মানসিক চাপে তিনি নিজের চেয়ারে বসেই অচেতন হয়ে পড়েন।

ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়ে যখন দেখা যায়, অভিযুক্তদের একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ করে পুরো ঘটনাটি প্রচার করছিল। পরে অসুস্থ অবস্থায় রেজাউল করিমকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে Sylhet MAG Osmani Medical College Hospital-এ স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও আতঙ্ক থেকেই তিনি স্ট্রোক করেছেন।

এই ঘটনার পর একটি মামলা দায়ের করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী মহলের মধ্যস্থতায় বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করা হয়। তবে এই ধরনের সমঝোতা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে Kishoreganj জেলার একটি বিদ্যালয়ে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিক হঠাৎ করে এক সংগঠিত মবের মুখোমুখি হন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পরিচালনা কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থীদের উসকে দেয়।

সেদিন শিক্ষার্থীদের ক্লাস থেকে বের করে আন্দোলনে নামানো হয় এবং বাইরে থেকে আসা কিছু ব্যক্তি ভয়ভীতি দেখিয়ে মিছিলে যুক্ত করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে প্রধান শিক্ষকের বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। প্রাণভয়ে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন এবং সেখানে মানসিক চাপে স্ট্রোক করেন। পরে তাঁকে Shaheed Syed Nazrul Islam Medical College Hospital-এ ভর্তি করা হয়, যেখানে তিনি প্রায় দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হলেও তদন্তে সেগুলোর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় যে মানসিক আঘাত তিনি পেয়েছেন, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নিজেই জানিয়েছেন, পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় তিনি আইনি পদক্ষেপ নেননি, যদিও ঘটনার পেছনে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল বলে তাঁর দাবি।

আরেকটি ঘটনা ঘটে Shariatpur জেলার গোসাইরহাটে। কোদালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন মৃধা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মবের চাপে পড়ে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যদিও শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, তারা মূলত বিদ্যালয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনকে ব্যবহার করে একটি পক্ষ প্রধান শিক্ষককে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

পরিবারের সদস্যদের মতে, এই চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি স্ট্রোক করেন এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি আবার চাকরিতে ফিরলেও ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় ঘটনাটির মানসিক অভিঘাত কতটা গভীর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা—সব মিলিয়ে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য শিক্ষকদের টার্গেট করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মব সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই বিচারক হয়ে ওঠে, তখন সমাজে অরাজকতা বাড়ে। শিক্ষকদের মতো সম্মানজনক পেশার মানুষ যদি এই সহিংসতার শিকার হন, তাহলে তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই অশনি সংকেত।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা বলছেন, শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তারা দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগের কঠোরতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো গুজব বা উসকানিতে তারা প্রভাবিত না হয়।

সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের ওপর মব সহিংসতার এই প্রবণতা একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন সময় এসেছে এই সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার না হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত