‘ধ্বংসের মুখে’ ইরান, নৌ অবরোধ প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার
হরমুজ ইস্যু ট্রাম্প দাবি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, নৌ অবরোধের চাপে ইরান বর্তমানে “পতনের দ্বারপ্রান্তে” পৌঁছে গেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে হরমুজ প্রণালি ও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে দ্রুত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে তারা কঠিন সংকটে রয়েছে এবং দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান নিজেদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সে কারণেই এই অনুরোধ এসেছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এই দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক ধরনের অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে বলে ওয়াশিংটন জানিয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প একতরফাভাবে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পরে হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করে যে, ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধাবসানের একটি নতুন প্রস্তাব এসেছে এবং তা নিয়ে ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা টিম আলোচনা করেছে।

যদিও কোনো পক্ষই প্রস্তাবের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে পৃথক আলোচনার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এই প্রস্তাবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন।

বিশ্ব রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে থাকে। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধ সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, এটি তাদের প্রত্যাশার তুলনায় ভালো। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে সরে আসতে হবে। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।

একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ বা টোল আরোপের বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কো রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালিকে কোনোভাবেই অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা টোল আদায়ের কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য হবে না।

এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি বন্দরে যাওয়া ঠেকাতে এখন পর্যন্ত ৩৯টি জাহাজকে বাধা দেওয়া বা ফেরত পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ৩৫টি ইরানি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন অর্থবিভাগের দাবি, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এখনও যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে এবং সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। ইরানি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, শত্রুপক্ষ নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলে তারা আরও শক্তিশালী ও আধুনিক উপায়ে জবাব দেবে। তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ওপর ইরানের কোনো আস্থা নেই এবং সে কারণেই তারা যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছে।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের শীর্ষ বৈঠকে নেতারা দ্রুত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সতর্ক করে বলেছে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই টানাপোড়েন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং পারমাণবিক ইস্যু—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহল এখন নজর রাখছে, শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনার পথে এগোবে, নাকি উত্তেজনা আবারও সংঘাতে রূপ নেবে। কারণ এই সংকটের ভবিষ্যৎ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত