শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে অস্থিরতা, বোর্ড নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট সংকট পরিস্থিতি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট আবারও এক গভীর প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সরকারী হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের (এসএলসি) শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় পুরো নেতৃত্ব একযোগে পদত্যাগ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা পারফরম্যান্স সংকট ও পরিচালনাগত সমালোচনার পর এবার প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি শাম্মি সিলভা সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পর বোর্ডের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরাও একে একে পদত্যাগপত্র জমা দেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী সুনীল কুমারা গামাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। এক বিশেষ সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় বোর্ডের নেতৃত্ব, যা কার্যত পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে শূন্যতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

শাম্মি সিলভা ২০১৯ সাল থেকে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট একাধিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় দলের ধারাবাহিক ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তাকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলে। ৬৫ বছর বয়সী এই প্রশাসক টানা চার মেয়াদে বোর্ডের নেতৃত্বে ছিলেন, যার মধ্যে তিনবার তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

তার নেতৃত্বকালীন সময়ে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট কিছু গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেও ফলাফল ছিল মিশ্র। চলতি বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে অংশ নিয়েও সুপার এইট পর্ব থেকেই বিদায় নেয় শ্রীলঙ্কা দল। এর আগে ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে দলের ব্যর্থতার পরও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যদিও তখন তিনি কিছু সময়ের জন্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

২০২৫ সালে তিনি আবারও এসএলসি সভাপতির দায়িত্বে ফিরে আসেন এবং একই বছরে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু তার পুনরাগমনের পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যার শেষ পরিণতি হিসেবে পুরো কার্যনির্বাহী কমিটির পদত্যাগ।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি স্থিতিশীল অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা। সরকার ইতোমধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত কমিটির নেতৃত্বে সাবেক সংসদ সদস্য ইরান বিক্রমরত্নের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ক্রিকেটের দুই কিংবদন্তি সিদাথ ওয়েত্তিমুনি এবং রোশান মহানামাকে প্রশাসনিক কাঠামোতে যুক্ত করার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

তবে এই প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং আইনি জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিদ্যমান বোর্ড সংবিধান অনুযায়ী সভাপতির পদ শূন্য হলে সহ-সভাপতিদের মধ্য থেকে একজনকে দায়িত্ব গ্রহণের কথা থাকলেও, সম্প্রতি উভয় সহ-সভাপতির পদত্যাগের ফলে সেই পথও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সরকার যদি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে নতুন কমিটি গঠন করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

১৯৭৩ সালের ক্রীড়া আইনের মাধ্যমে সরকার চাইলে জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা পুনর্গঠন করতে পারে, তবে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আইসিসি সবসময় স্বাধীন পরিচালনার ওপর জোর দিয়ে আসছে। অতীতে দেখা গেছে, সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটকে সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আইসিসি আবারও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বর্তমানে একাধিক স্তরের সংকটে রয়েছে। একদিকে মাঠের পারফরম্যান্স, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু বোর্ডই নয়, জাতীয় দলের ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দেশটির ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একসময় বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তিশালী অবস্থান থাকা শ্রীলঙ্কা এখন ধারাবাহিক পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সমর্থকরা আশা করছেন, দ্রুত একটি স্থিতিশীল প্রশাসন গড়ে উঠবে, যা ক্রিকেটকে আবারও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের সামনে পথ সহজ নয়। প্রশাসনিক পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে দেশটির ক্রিকেট ভবিষ্যৎ এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত