প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব প্রযুক্তি অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ, কাঠামো এবং উদ্দেশ্য নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ে এবার সরাসরি আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। শুনানিতে তিনি দাবি করেছেন, ওপেনএআই মূলত তার “মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা” ছিল এবং এটি মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নেতৃত্ব সেই মূল আদর্শ থেকে সরে এসেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে টেসলা ও স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক ওপেনএআই-এর বর্তমান কাঠামো নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যদি দাতব্য বা মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগকে পরে মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায় রূপান্তর করা বৈধ হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো দাতব্য ব্যবস্থার ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। তার মতে, ওপেনএআই-এর ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে।
মাস্ক আদালতে বলেন, ওপেনএআই-এর ধারণা, নাম এবং প্রাথমিক কাঠামো তৈরির পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক অর্থায়ন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যুক্ত করা এবং ধারণাটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তার ভাষায়, এটি এমন একটি উদ্যোগ ছিল যা ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
ওপেনএআই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অন্যতম বড় নাম। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠার সময় ওপেনএআই নিজেদের অলাভজনক ও উন্মুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। মাস্কের অভিযোগ, পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে করপোরেট মুনাফাকেন্দ্রিক কাঠামোতে রূপ নেয়।
মাস্ক সম্প্রতি ওপেনএআই, এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান এবং প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, ওপেনএআই-এর নেতৃত্ব তাদের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে এমনভাবে পরিচালনা করছে যা জনস্বার্থের চেয়ে আর্থিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে আদালতে ওপেনএআই-এর পক্ষ থেকেও পাল্টা যুক্তি তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী উইলিয়াম সাভিট বলেন, বাস্তবে ওপেনএআই-কে মুনাফাভিত্তিক কাঠামোয় নেওয়ার ধারণা প্রথমদিকে ইলন মাস্কের পক্ষ থেকেই এসেছিল। তিনি দাবি করেন, মাস্ক প্রতিষ্ঠানটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন এবং ভবিষ্যতে নিজে প্রধান নির্বাহী হওয়ারও আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
ওপেনএআই-এর আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি যখন দ্রুত বড় হতে শুরু করে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ ও কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে গুগলের ডিপমাইন্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গেলে বিপুল ব্যয় অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সে কারণেই ২০১৯ সালে ওপেনএআই একটি মুনাফাভিত্তিক ইউনিট গঠন করে বলে তারা আদালতে ব্যাখ্যা দেয়।
আইনজীবীরা আরও বলেন, বিশ্বমানের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের ধরে রাখতে এবং নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিকল্প ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে মাইক্রোসফটসহ বিভিন্ন বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এ অর্থায়ন করে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে মাইক্রোসফটের ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে মাস্কের আইনজীবী স্টিভেন মোলো আদালতে বলেন, ওপেনএআই-এর বর্তমান অবস্থান মূল আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। তার মতে, এটি কখনোই মানুষের ধনী হওয়ার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার কথা ছিল না। বরং মানবজাতির জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার ফলাফল শুধু ওপেনএআই নয়, পুরো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এটি প্রযুক্তি খাতে অলাভজনক উদ্যোগ, করপোরেট বিনিয়োগ এবং জনস্বার্থের ভারসাম্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও নৈতিকতা নিয়ে বিতর্কও। ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও উদ্দেশ্য নিয়ে এই আইনি লড়াই ভবিষ্যতে প্রযুক্তি খাতের নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে আদালত সূত্র জানিয়েছে, মামলার শুনানি আগামী দিনগুলোতেও চলবে এবং ইলন মাস্ক আরও সাক্ষ্য দিতে পারেন। প্রযুক্তি বিশ্ব এখন গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে, শেষ পর্যন্ত এই বহুল আলোচিত মামলার রায় কোন দিকে যায় এবং তা ওপেনএআই ও বৈশ্বিক এআই শিল্পে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।