রূপপুরে ৩ বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী আগামী তিন বছর এই কেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া, ফলে এই সময়ের মধ্যে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো ধরনের উদ্বেগ থাকবে না।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। এটি নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থই ঋণ হিসেবে দিয়েছে রাশিয়া, যা আগামী ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

মঙ্গলবার বিকেলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়। এই মুহূর্তটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের নির্মাণ ও পরীক্ষামূলক ধাপ শেষে এখন কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রথম তিন বছর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে। এরপরও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে, যেখানে প্রতি দুই বছর পর পর ব্যবহৃত জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এটি একটি স্বাভাবিক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া।

রূপপুর প্রকল্পকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে কম খরচে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাতে এই প্রকল্পকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর উচ্চ জ্বালানি দক্ষতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হয়। সেখানে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ২৭ টন ইউরেনিয়াম জ্বালানি।

এছাড়া গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে বছরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমান।

বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ কয়লা ও গ্যাস আমদানিনির্ভর এবং ব্যয়বহুল হলেও পারমাণবিক জ্বালানির মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।

ব্যবহৃত জ্বালানি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে, যা পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এছাড়া পুরো প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পের আয়ুষ্কাল প্রায় ৬০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এটি আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয়, বরং দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে দেশীয় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদিও প্রকল্পটি বড় অঙ্কের ঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমাতে সহায়তা করবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচের সঙ্গে তুলনা করলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে দেশের জ্বালানি খাতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হবে।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়া বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং দেশের জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত