প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষের জীবন এক বিচিত্র সংগ্রাম আর পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপার সংমিশ্রণ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যা আমাদের অন্তরাত্মাকে নাড়া দেয় এবং জীবন দর্শনের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। তেমনই একটি হৃদস্পর্শী ও শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ইসলামের ইতিহাসে, যা আমাদের শেখায় ধৈর্য এবং প্রতিটি দানা খাবারের গুরুত্ব। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিসটি কেবল একটি ইতিহাস নয়, বরং কিয়ামতের কঠিন ময়দানে মানুষের প্রতিটি নিয়ামত ভোগের হিসাব প্রদানের এক সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জগতের প্রতিটি ছোট-বড় প্রাপ্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
এক অন্ধকার রাত বা দিনের স্নিগ্ধ আলোয় মদিনার শান্ত পরিবেশে যখন ক্ষুধা মানুষের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন রহমতের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ গৃহ থেকে বের হয়েছিলেন। এই বের হওয়াটা কোনো বিলাসের জন্য ছিল না, বরং পেটের তীব্র ক্ষুধা মেটানোর একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টামাত্র ছিল। পথিমধ্যে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে ইসলামের ইতিহাসের দুই প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর সাথে। মহানবী (সা.) তাঁদের দেখে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করেন যে, অসময়ে কেন তাঁরা ঘরের বাইরে অবস্থান করছেন। তাঁদের উত্তর ছিল অত্যন্ত করুণ এবং বাস্তবসম্মত। তাঁরা বিনয়ের সাথে জানালেন যে, ক্ষুধার অসহ্য যন্ত্রণাই তাঁদের এই মুহূর্তে গৃহত্যাগী করেছে।
এই পর্যায়ে মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী (সা.) এক অমোঘ সত্য প্রকাশ করলেন। তিনি তাঁর পবিত্র জীবনের কসম খেয়ে বললেন যে, যে ক্ষুধার তাড়নায় তাঁরা বের হয়েছেন, ঠিক একই কারণে তিনিও ঘর থেকে বের হতে বাধ্য হয়েছেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে, রাষ্ট্রনায়ক হয়েও নবীজি (সা.) তাঁর সাধারণ সাহাবিদের মতোই অনাহার ও কষ্টের জীবন অতিবাহিত করতেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে নিয়ে একজন আনসারি সাহাবির বাড়ির দিকে রওনা হলেন। গন্তব্যে পৌঁছে দেখা গেল সেই আনসারি সাহাবি বাড়িতে নেই। তবে তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে মেহমানদের অভ্যর্থনা জানালেন এবং তাঁদের উপস্থিতিকে পরম সৌভাগ্য হিসেবে গণ্য করলেন।
স্বামীর অনুপস্থিতিতেও মেহমানদারির এই যে সংস্কৃতি, তা ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। কিছুক্ষণ পর যখন সেই আনসারি সাহাবি বাড়িতে ফিরে এলেন এবং নবীজি (সা.) সহ বিশিষ্ট সাহাবিদের দেখতে পেলেন, তাঁর আনন্দের সীমা রইল না। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন যে, আজ তাঁর বাড়িতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেহমানদের পদধূলি পড়েছে, যা তাঁর জীবনের এক বড় প্রাপ্তি। তিনি তৎক্ষণাৎ বাগান থেকে কাঁচা, শুকনো ও পাকা খেজুরের একটি বড় কাঁদি নিয়ে এসে তাঁদের সামনে নিবেদন করলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মেহমানরা যেন সেরা আপ্যায়ন পান। এরপর তিনি যখন একটি ছাগল জবাই করতে ছুরি হাতে নিলেন, তখন দয়ালু নবী (সা.) তাঁকে সাবধান করে দিলেন যেন তিনি দুধওয়ালা কোনো বকরি জবাই না করেন। এটি পশুদের প্রতি দয়া এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারের এক মহান শিক্ষা।
রন্ধনকার্য সমাপ্ত হওয়ার পর তাঁরা সকলে তৃপ্তিসহকারে গোশত, খেজুর এবং সুমিষ্ট পানি পান করলেন। দীর্ঘ ক্ষুধার পর এই আহার ছিল এক জান্নাতি প্রশান্তি। কিন্তু ঠিক এই পরম তৃপ্তির মুহূর্তেই নবীজি (সা.) এক গাম্ভীর্যপূর্ণ বাণী উচ্চারণ করলেন। তিনি তাঁর সাথীদের উদ্দেশ্য করে বললেন যে, আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিনে এই সামান্য নিয়ামত সম্পর্কেও তোমাদের প্রশ্ন করা হবে। তোমরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়েছিলে এবং এখন পেট ভরে খাবার নিয়ে ঘরে ফিরছ—এই যে পরিবর্তন এবং এই যে অন্ন সংস্থান, এর প্রতিটির হিসাব দিতে হবে। এই বক্তব্যটি বর্তমান সময়ের অপচয়কারী সমাজের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। আমরা প্রতিনিয়ত কত খাবার নষ্ট করি এবং কত নিয়ামতের কথা ভুলে যাই, তার ইয়ত্তা নেই।
এই সংবাদটি আমাদের কেবল অতীত ইতিহাসের দিকে নিয়ে যায় না, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আজ যখন বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষ খাবারে বিলাসিতা করছে, তখন অন্য প্রান্তে অনেক মানুষ এক মুঠো অন্নের জন্য হাহাকার করছে। মহানবী (সা.)-এর এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি গ্রাস ভাতের পেছনে মহান আল্লাহর অশেষ করুণা কাজ করে। ক্ষুধা মানুষকে বিচলিত করতে পারে কিন্তু নিয়ামত প্রাপ্তির পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই হলো মুমিনের পরিচয়। এই হাদিসের প্রতিটি পরত আমাদের বিনয়ী হতে শেখায় এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় অন্তরে জাগ্রত করে।
পরিশেষে বলা যায়, এই ঘটনাটি কেবল একটি গল্পের মতো পড়ে যাওয়ার বিষয় নয়। এটি হৃদয়ে ধারণ করার মতো এক জীবনদর্শন। আমরা যখনই কোনো সুস্বাদু খাবার সামনে পাব বা তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাওয়ার পর শীতল পানি পান করব, তখনই আমাদের মনে করা উচিত যে এর জন্য আমাদের জিজ্ঞাসিত হতে হবে। আবু বকর ও ওমর (রা.)-এর মতো মহান ব্যক্তিরা যদি সামান্য খেজুর আর পানির জন্য জিজ্ঞাসিত হওয়ার ভয় পান, তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের আরও কত বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। “একটি বাংলাদেশ অনলাইন”-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা পাঠকদের এই বার্তা দিতে চাই যে, সম্পদ বা নিয়ামত কেবল ভোগের জন্য নয়, এটি একটি আমানত যা সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই কেবল পরকালে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।