কম বয়সে চুল পাকা: বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০ বার
অল্প বয়সে চুল পাকা

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে কানাডার কিশোরী অ্যাশলে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় ধূসর বা পাকা চুল দেখতে পান, তখন তার মনে তৈরি হয় ভয়, উদ্বেগ এবং মানসিক অস্থিরতা। সাধারণত এই বয়সে যেখানে পড়াশোনা, খেলাধুলা আর আনন্দই প্রধান, সেখানে এমন পরিবর্তন তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। তবে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা এখন আর বিরল নয়—বিশ্বজুড়ে অনেক কিশোর-কিশোরীর মধ্যেই অল্প বয়সে চুল পাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুলের রং নির্ধারণ করে মেলানিন নামক এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ, যা চুলের গোড়ায় থাকা বিশেষ কোষ থেকে তৈরি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কোষগুলোর কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়, ফলে চুল ধূসর বা সাদা হয়ে যায়। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে কম বয়সেই শুরু হয়, তখন তাকে অকালপক্বতা বলা হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, অল্প বয়সে চুল পাকার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জিনগত প্রভাব। অর্থাৎ পরিবারের বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে যদি কারও কম বয়সে চুল পাকার ইতিহাস থাকে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এটি একটি প্রাকৃতিক ও অনেক ক্ষেত্রে অনিবার্য প্রক্রিয়া হিসেবেও বিবেচিত।

তবে শুধু জিন নয়, আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনও এই সমস্যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি এবং দূষণ—সব মিলিয়ে চুলের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে জীবনে তরুণদের মধ্যে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে মানসিক চাপ বাড়ছে, যা চুলের রঙ হারানোর প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে তুলতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, শরীরে আয়রন, জিংক, কপার এবং ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি থাকলে চুলের স্বাভাবিক রং ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব পুষ্টি উপাদান চুলের কোষকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ, পানির অভাব এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও চুলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মানসিক চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ, ভয় বা হতাশা শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চাপের কারণে চুল অকালেই সাদা হয়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া পরিবেশগত কারণও উপেক্ষা করার মতো নয়। বায়ুদূষণ, ধূমপান এবং রাসায়নিকযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার চুলের স্বাস্থ্য নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে তরুণ বয়সে হেয়ার ডাই বা কেমিক্যাল ব্যবহার করলে চুলের রং পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

তবে আশার কথা হলো, কিছু ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রতিরোধযোগ্য। চিকিৎসকরা বলছেন, যদি পুষ্টির ঘাটতির কারণে চুল পাকে, তাহলে সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে কিছুটা উন্নতি সম্ভব। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস চুলের অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

প্রতিরোধের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন ফলমূল, শাকসবজি এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং মানসিক চাপ কমাতে যোগব্যায়াম বা হালকা ব্যায়াম করা। একই সঙ্গে ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং দূষণ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা চুলের জন্য উপকারী হতে পারে।

তবে চিকিৎসকদের সতর্কতা হলো, যদি চুল পাকার কারণ জিনগত হয়, তাহলে তা পুরোপুরি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এর গতি ধীর করাই মূল লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, কম বয়সে চুল পাকা মানেই বড় কোনো রোগ নয়। তবে এটি শরীরের ভেতরের কোনো ঘাটতি বা জীবনযাত্রার সংকেত হতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে বরং সঠিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং মানসিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে এ সমস্যাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত