প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহান মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মসংস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি দাবি করেছেন, দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিএনপি সবচেয়ে বড় এবং বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। একইসঙ্গে তিনি শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেছেন।
শুক্রবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত মে দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিকদের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এবং এ ক্ষেত্রে বিএনপি একটি বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতারও একটি বড় কারণ। একজন তরুণ যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তাহলে শুধু তার নিজের জীবনই বদলায় না, বরং পরিবার ও সমাজও ইতিবাচক পরিবর্তনের মুখ দেখে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একজন বেকার সন্তানের জন্য পরিবারের যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, চাকরি পাওয়ার পর সেই চাপ কমে যায় এবং সেটিই প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বস্তি।
আলোচনা সভায় তিনি শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস ও মে দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বহু সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এগিয়েছে। কিন্তু এখনও বিশ্বের অনেক জায়গার মতো বাংলাদেশেও শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য শ্রমিকদের মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন। তার ভাষায়, একজন শ্রমিক শুধু উৎপাদনের অংশ নয়, তিনি রাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম অবশ্যই গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিচালিত হওয়া উচিত। কারণ দেশের স্বাধীনতা, স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা অস্থিতিশীলতা যেন দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা দলের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণ যে ইশতেহারের ভিত্তিতে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দলীয় সরকারের। শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা সহযোগিতা করবেন, তবে প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পথও খোলা থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মে দিবসে শ্রমিক অধিকার নিয়ে বিএনপির এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের শিল্পখাতে শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি বৈষম্য এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের আন্দোলন বারবার আলোচনায় এসেছে।
শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোর একটি হলো শ্রমনির্ভর শিল্প। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা মনে করেন, শ্রমিকদের জন্য শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, বরং স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং দক্ষতা উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে মে দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শ্রমখাতে আরও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের মধ্যে শ্রমিকদের কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মানবিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্যে যে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো ‘গঠনমূলক আন্দোলন’। তিনি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে সংঘাতমুখী না করে আলোচনাভিত্তিক ও সাংবিধানিক পথে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বার্তা দেশের শ্রম-রাজনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে মহান মে দিবসে বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে দেওয়া এই বক্তব্য দেশের শ্রমনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।