বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের দাবিতে মে দিবস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের দাবিতে মে দিবস

প্রকাশ: ২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি, বিক্ষোভ ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে মহান মে দিবস। ইউরোপ থেকে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য—সবখানেই শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বেতন বৈষম্য কমানো, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিক এই দিবসটি ঘিরে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অংশ নেন বিভিন্ন র‌্যালি ও সমাবেশে। বিশেষ করে লিসবন-এ আয়োজন করা র‌্যালি ছিল এবারের মে দিবসের অন্যতম বৃহৎ কর্মসূচি। সেখানে দেশটির প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপি-এর উদ্যোগে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ঢাক-ঢোল, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এভিনিদা আলমিরানতে রেইস পরিণত হয় এক বিশাল শ্রমিক সমুদ্রে।

লিসবনের এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা সপ্তাহে ৩৫ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি প্রস্তাবিত নতুন শ্রম আইন বা “লেবার প্যাকেজ”-কে তারা শ্রমিক স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের আহ্বান জানান। সমাবেশে অভিবাসী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও নিজেদের অধিকার ও সমান সুযোগের দাবি তুলে ধরেন।

একইভাবে প্যারিস-এও মে দিবস ঘিরে দেখা গেছে ব্যাপক জনসমাগম। ফ্রান্সজুড়ে আয়োজিত বিভিন্ন সমাবেশে তিন লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন বলে জানা যায়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, দেশে বসবাসরত কয়েক লাখ অনিয়মিত অভিবাসীর নিয়মিতকরণ এবং শ্রমিক অধিকার আরও শক্তিশালী করা। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরজুড়ে বিক্ষোভকারীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে তাদের দাবি তুলে ধরেন।

বার্লিন-এও মে দিবস ছিল ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শহরের নয়াকোলন ও ক্রয়েজবার্গ এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে যুদ্ধবিরোধী, শোষণবিরোধী ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে স্লোগান দেন। সেখানে বক্তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমালোচনা করে শ্রমিকদের অধিকার সংকুচিত হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। একইসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।

বার্লিনে এক অংশগ্রহণকারী বলেন, শ্রমিক হিসেবে মে দিবস পালন করা তাদের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অধিকার রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক। তার মতে, ক্রমশ কর্মীদের অধিকার সংকুচিত হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষ আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

ইতালি-তে মে দিবস উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বিশেষ কনসার্ট, যা শ্রমিক সংগঠনগুলোর বার্ষিক ঐতিহ্য। সেখানে সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রমিকদের ঐক্য ও সংহতির বার্তা দেওয়া হয়। নেতারা শ্রমিক অধিকার রক্ষায় একতাবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

মালদ্বীপ-এও মে দিবস পালিত হয়েছে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভার মাধ্যমে। রাজধানীতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় ও প্রবাসী শ্রমজীবীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিজেদের অধিকার ও দাবি তুলে ধরেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে তুরস্ক-এর ইস্তাম্বুল-এ মে দিবস ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক তাকসিম স্কয়ারে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং ৫০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। ২০১২ সাল থেকে এই এলাকায় শ্রমিক সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকায় উত্তেজনা আরও বাড়ে।

স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আটক করার সময় অনেক বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। একইসঙ্গে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন ও সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

আর্জেন্টিনা-তেও মে দিবস ঘিরে শ্রমিকদের বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী বুয়েনস এইরেস-এ হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-এর শ্রম আইন সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। শ্রমিকদের অভিযোগ, নতুন নীতিমালার ফলে পুরনো শ্রমিক সুরক্ষা আইন দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা তাদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

দেশটির বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) সরকারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আন্দোলনের ডাক দেয়। সংগঠনটির নেতারা বলেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন।

বিশ্বব্যাপী এই মে দিবস পালিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক দেশে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, যা তাদের আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বছরের মে দিবস শুধু ঐতিহ্যবাহী শ্রমিক দিবস হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান সংকট এবং শ্রমিক শ্রেণির চাপে থাকা অবস্থার একটি শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহরে একই ধরনের দাবির প্রতিধ্বনি প্রমাণ করে যে শ্রমিক অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মহান মে দিবস এবারও বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য, প্রতিবাদ এবং অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন বাস্তবতায় হলেও শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল একটাই—ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সম্মানজনক জীবন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত