চীন আফ্রিকা বাণিজ্য নীতি শূন্য শুল্ক ঘোষণা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
চীন আফ্রিকা বাণিজ্য নীতি শূন্য শুল্ক ঘোষণা

প্রকাশ: ২ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করতে নতুন এক বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। এসওয়াতিনি বাদে আফ্রিকার প্রায় সব দেশের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা কার্যকর করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি। এই নীতি ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। তবে এই পদক্ষেপকে ঘিরে যেমন সম্ভাবনার আলোচনা শুরু হয়েছে, তেমনি এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন অর্থনীতিবিদরা।

শুক্রবার (১ মে) থেকে কার্যকর হওয়া এই নীতির আওতায় আফ্রিকা মহাদেশের ৫৩টি দেশ চীনে রপ্তানি ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এর মাধ্যমে আফ্রিকান দেশগুলোর পণ্য চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন সরকার বলছে, এটি একটি একতরফা উদার বাণিজ্য নীতি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে।

তবে এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে এসওয়াতিনি-কে। কারণ দেশটি এখনো তাইওয়ান-এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। চীনের দীর্ঘদিনের “এক চীন নীতি” অনুযায়ী তাইওয়ানকে স্বীকৃতি না দেওয়া দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যার প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে এই বাণিজ্য নীতিতে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই শুল্কমুক্ত সুবিধা আফ্রিকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কফি, বাদাম, কোকো ও অ্যাভোকাডোর মতো পণ্যের রপ্তানি বাড়তে পারে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকা-চীন বাণিজ্য এখনো ব্যাপকভাবে ভারসাম্যহীন, যেখানে সুবিধা অনেকটাই চীনের দিকে ঝুঁকে আছে।

বর্তমানে চীন ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে। আফ্রিকার দেশগুলো প্রধানত কাঁচামাল রপ্তানি করে এবং প্রস্তুত পণ্য আমদানি করে। এই কারণে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আফ্রিকার বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০২ বিলিয়ন ডলারে, যা মহাদেশটির অর্থনৈতিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র শুল্কমুক্ত সুবিধা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আফ্রিকার অনেক দেশের শিল্প অবকাঠামো দুর্বল, উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত এবং লজিস্টিক ব্যবস্থা অপ্রতুল। ফলে শুল্ক কমলেও সব দেশ সমানভাবে এর সুফল পাবে না। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর বা মরক্কোর মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো বেশি সুবিধা নিতে পারবে, কিন্তু দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো পিছিয়ে পড়বে।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, আফ্রিকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন বৈচিত্র্য আনা। বর্তমানে অনেক দেশ মাত্র কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা বৈশ্বিক বাজারে তাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যদি তারা শিল্পায়ন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারে, তাহলে শুল্কমুক্ত সুবিধা থেকেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া কঠিন হবে।

চীনের এই পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক কৌশলগত অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। আফ্রিকায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে চীন দীর্ঘমেয়াদে তার বৈশ্বিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। অবকাঠামো, খনিজ সম্পদ এবং বাজার—সব ক্ষেত্রেই আফ্রিকা চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রাজনীতিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার কয়েকটি দেশের ওপর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল। যদিও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের সিদ্ধান্তে সেই শুল্কের বড় অংশ কমিয়ে আনা হয়, তবুও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় শক্তিগুলোর নীতি পরিবর্তনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির এই ভিন্ন অবস্থান আফ্রিকার অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে নতুন বাজারের সুযোগ, অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক চাপ—দুই দিকই আফ্রিকান দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে সাধারণভাবে আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে এই শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে আশাবাদও রয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা মনে করছেন, এটি তাদের পণ্যের জন্য একটি বড় বাজার উন্মুক্ত করবে। বিশেষ করে কৃষি ও হালকা শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে চীনের এই শূন্য শুল্ক নীতি আফ্রিকা-চীন বাণিজ্য সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। তবে এর প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করবে আফ্রিকার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা, শিল্প উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। এখন দেখার বিষয়, এই নীতি সত্যিই আফ্রিকার অর্থনীতিকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে, নাকি এটি শুধু বড় অর্থনীতির কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত