প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুদ্ধের চাপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি—সব মিলিয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ইরান। দেশটির সাধারণ মানুষ এখন প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন। একসময় যে বাজার থেকে একটি পরিবার মাসজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারত, এখন সেই একই বাজারে কয়েক দিনের খাদ্যপণ্য কেনাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের নতুন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে।
এই সংকট এমন সময়ে তীব্র আকার নিয়েছে, যখন ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে সংঘাত কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিশ্চিত ও কষ্টকর।
রোববার সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কঠোর বাস্তবতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, জনগণকে দেশের সীমাবদ্ধতাগুলো বাস্তবভাবে বুঝতে হবে। সামনে আরও কঠিন সময় আসতে পারে, তবে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমেই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য অনেকের কাছে বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কারণ গত কয়েক বছরে একের পর এক অর্থনৈতিক ধাক্কায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। অনেক পরিবার এখন আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম খাদ্য কিনতে পারছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশটিতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে খাদ্যপণ্যের বাজারে। সরকারি হিসাবেই দেখা গেছে, এক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ১১৫ শতাংশ। কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ পর্যন্ত।
তেহরানের বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, প্রতিদিন বাজারে গিয়ে নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গত মাসে যে পরিমাণ খাদ্য কিনতে পারতেন, এই মাসে সেই একই অর্থে অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা বলছেন, তাদের বেতনের বড় অংশ এখন শুধু চাল-ডাল কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রাজধানী তেহরানের এক স্কুলশিক্ষক স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আগে আমরা সপ্তাহে একদিন হলেও মাংস কিনতে পারতাম। এখন মাসে একবারও সম্ভব হয় না। সন্তানদের প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে।” একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ থেকেও।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক বছর আগে যেখানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যেত প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার রিয়াল, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭০ হাজারে। ফলে আমদানিনির্ভর খাদ্য ও ওষুধের দাম আরও বেড়ে গেছে।
মুদ্রার এই ধস শুধু বাজারে মূল্যবৃদ্ধিই ঘটায়নি, বরং মানুষের সঞ্চয়কেও প্রায় মূল্যহীন করে ফেলেছে। অনেক পরিবার বহু বছরের জমানো অর্থ দিয়েও এখন প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ দ্রুত দারিদ্র্যের দিকে চলে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংকট আরও গভীর হয়েছে টানা ৭২ দিনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে। সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে ইন্টারনেট সীমিত করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠন ও প্রযুক্তিখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে দেশের স্টার্টআপ, অনলাইন ব্যবসা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা আয় হারিয়েছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল অর্থনীতি যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় ভিত্তি। সেখানে দীর্ঘদিন ইন্টারনেট সীমিত থাকলে শুধু ব্যবসাই নয়, শিক্ষা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানে এখন সেই বহুমাত্রিক প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমিত নগদ সহায়তা ও ডিজিটাল ভাউচার চালু করেছে। তবে মাথাপিছু সহায়তার পরিমাণ ১০ ডলারেরও কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের কষ্ট খুব একটা কমছে না। বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে সরকার বড় আকারের সহায়তা দিতে পারছে না বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
ইরানের কট্টরপন্থী নেতাদের অনেকে এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং “বিদেশি ষড়যন্ত্র”-কে দায়ী করছেন। তাদের মতে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক চাপ ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী।
এদিকে মার্কিন নৌ-অবরোধ ও আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতার কারণে ইরানের বৈদেশিক বাণিজ্যও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকারের আয় কমে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি সামাজিক ও মানবিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে তুলছে। অনেক পরিবার এখন দৈনিক খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক উত্তেজনার বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করছে সাধারণ মানুষ। তাই সংকট সমাধানে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও জরুরি।
ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। তবে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে সেই পথ সহজ হবে না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।