ঈদে দেশজুড়ে বসছে ৩৬০০ পশুর হাট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
ঈদে দেশজুড়ে বসছে ৩৬০০ পশুর হাট

প্রকাশ: ১১ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কোরবানির পশুর হাট প্রস্তুতের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই জমে উঠতে শুরু করেছে ঈদকেন্দ্রিক পশু বাণিজ্যের প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই থাকছে ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট, যেখানে লাখো ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঈদুল আজহা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর এই উৎসবকে ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে গবাদিপশু খামার, পরিবহন, পশুখাদ্য, চামড়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের জন্য এটি একটি বড় অর্থনৈতিক মৌসুম। তাই পশুর হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা কার্যক্রম ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন এসব হাটে চলছে অবকাঠামো নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ। বাঁশের অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ, শামিয়ানা টানানো, পশুর রাখার জায়গা প্রস্তুত, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার আগের চেয়ে আরও পরিকল্পিতভাবে হাট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ রাজধানীতে পশুর হাট মানেই কয়েক দিনের জন্য বিশাল জনসমাগম, যানজট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা। তাই এবার শুরু থেকেই পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পশু আনার প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। উত্তরাঞ্চল, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, মেহেরপুর, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের খামারিরা তাদের গরু, ছাগল ও মহিষ রাজধানীমুখী করতে শুরু করেছেন। আগামী সপ্তাহ থেকে ঢাকার হাটগুলোতে পশু আসা শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খামারিরা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশীয় খামারে পশু উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে এবারও কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না বলে তারা আশাবাদী। বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এতে ক্রেতারা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক দামে পশু কিনতে পারবেন বলেও ধারণা করছেন অনেকে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। অন্যদিকে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এই পরিসংখ্যান দেশীয় খামার ব্যবস্থার অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে গবাদিপশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কয়েক বছর আগেও ভারত থেকে অবৈধভাবে বিপুল সংখ্যক পশু আসত। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় খামারিরাই কোরবানির পশুর অধিকাংশ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে পশুর হাটকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। প্রশাসন জানিয়েছে, হাটগুলোতে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলও বাড়ানো হবে। কারণ প্রতি বছর কোরবানির হাটে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ লেনদেন হয়, যা অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাই চুরি, ছিনতাই কিংবা জাল টাকার প্রতারণা ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে।

শুধু নিরাপত্তাই নয়, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি বড় হাটে ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম রাখা হবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এসব টিম পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ পশু শনাক্তকরণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দেবে। পাশাপাশি হরমোন বা ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হবে।

হাটে আসা ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, এখন তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। শুধু বড় গরু নয়, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পশু কেনার দিকেও তারা নজর দিচ্ছেন। ফলে খামারিরাও এখন পশু মোটাতাজাকরণে প্রাকৃতিক পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, নিয়মের বাইরে কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। সড়ক দখল করে কিংবা যত্রতত্র পশুর হাট স্থাপনের সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তার মতে, নাগরিক ভোগান্তি কমিয়ে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশে হাট পরিচালনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এবার পাঁচ দিনব্যাপী পশুর হাটে কেনাবেচা চলবে। শেষ মুহূর্তে হাটগুলোতে আরও সাজসজ্জা এবং অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করা হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, শুক্রবারের পর থেকেই হাটগুলোতে জমজমাট পরিবেশ তৈরি হবে।

এদিকে সীমান্ত এলাকায় পশুর হাট বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তপথে অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে দেশীয় খামারিরা আরও বেশি লাভবান হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন থেকেই ঈদের আমেজ অনুভূত হতে শুরু করেছে। কোথাও বাঁশের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, কোথাও চলছে মাইকিং, আবার কোথাও ব্যবসায়ীরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এসব ফাঁকা জায়গা গরু-ছাগলের ডাক আর মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠবে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোরবানির পশুর হাট শুধু ধর্মীয় উৎসবের অংশ নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রতি বছর এই বাজারকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। ফলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে এবার কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে পশুর হাট প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার অপেক্ষা—কবে থেকে পুরোপুরি জমে উঠবে দেশের সবচেয়ে বড় এই মৌসুমি বাজার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত