চার সপ্তাহের মধ্যেই কমবে হামের ঝুঁকি, আশ্বাস স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ১৫ বার
চার সপ্তাহে কমবে হাম পরিস্থিতি, জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আশার বার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, সম্প্রতি যেসব শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, তাদের শরীরে পূর্ণ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগবে। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছে সরকার। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, বিগত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা না থাকায় দেশে হাম সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।

সোমবার (১১ মে) সকালে বরিশাল সদর হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। হঠাৎ করেই হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখেন মন্ত্রী। এ সময় তিনি চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে তিনি রোগীদের চিকিৎসা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ ও মতামত শোনেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের টিকা সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর দেওয়া প্রয়োজন হলেও ২০২০ সালের পর থেকে বিভিন্ন কারণে টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটে। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। সেই ঘাটতির প্রভাব এখন সংক্রমণ বৃদ্ধির মাধ্যমে সামনে এসেছে। তিনি বলেন, “যাদের টিকা দেওয়া হয়েছে, তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হতে চার সপ্তাহ সময় লাগবে। এরপর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আমরা আশা করছি।”

তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন মজুত ছিল না। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে নতুন করে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে গণটিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে, যা পরিস্থিতি উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। শুরুতে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও পরে সারা শরীরে লালচে দানা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে। তাই শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বরিশাল সদর হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়েও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারে গিয়ে এক কর্মীকে দায়িত্বস্থলে অনুপস্থিত দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন। পরে তিনি চিকিৎসকদের হাজিরা খাতা পরীক্ষা করেন এবং কর্মঘণ্টায় সবাই দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা যাচাই করেন।

হাসপাতালে উপস্থিত রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্যসেবার মান সম্পর্কে জানতে চান মন্ত্রী। কেউ কেউ চিকিৎসক সংকট, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা এবং ওষুধের ঘাটতির অভিযোগ তুললেও অনেক রোগী চিকিৎসকদের আন্তরিকতার প্রশংসাও করেন। মন্ত্রী এ সময় বলেন, সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। এখানে দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত মনিটরিং আরও বাড়ানো হবে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি জেলায় হাম রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকা নেওয়া শিশুরা তুলনামূলক নিরাপদ থাকলেও যারা এখনো টিকা নেয়নি, তাদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, করোনা মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছিল। অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ ছিল, আবার অনেক অভিভাবকও শিশুদের নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এর ফলে কিছু শিশুর টিকা নেওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই প্রভাব কয়েক বছর পর এসে বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকা কার্যক্রম চালালেই হবে না, পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। অনেক অভিভাবক এখনো হামকে সাধারণ রোগ হিসেবে দেখেন, যা বিপজ্জনক হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে হাম প্রাণঘাতীও হতে পারে, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের মানুষ যেন সরকারি হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করছেন, তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে। একইসঙ্গে তিনি জনগণকে গুজব বা ভুল তথ্য এড়িয়ে সরকারি স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানান।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্প চালু করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেখানে অতিরিক্ত মেডিকেল টিম পাঠানো হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হবে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাত ধোয়া, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার মাধ্যমে হামের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সরকারও আশা করছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও উন্নতির দিকে যাবে এবং দেশে হামের সংক্রমণ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত