প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসকনের সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে ঘিরে আলোচিত একাধিক মামলার আইনি প্রক্রিয়া নতুন মোড় নিয়েছে। চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলাসহ চারটি মামলায় করা তার জামিন আবেদনের রায় ঘোষণা পিছিয়ে দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোমবার (১১ মে) বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ১৪ মে রায়ের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দাখিলের জন্য সময়ের আবেদন জানান। তার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রায় ঘোষণার তারিখ পিছিয়ে দেন। তবে সময় চাওয়ার এই আবেদনের বিরোধিতা করেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য। তিনি আদালতে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তার মক্কেল কারাগারে আছেন এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় দ্রুত শুনানি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে গত কয়েক মাসে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলা। ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালত ভবনের সামনে সংঘর্ষের ঘটনায় ওই আইনজীবী নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গতকাল রোববার একই হাইকোর্ট বেঞ্চ আলিফ হত্যা মামলায় চিন্ময়ের জামিন আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর সোমবার বাকি চার মামলায় জামিন আবেদনের বিষয়ে রায় ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে নথিপত্র দাখিলের প্রয়োজনীয়তার কারণে আদালত রায় পেছানোর সিদ্ধান্ত নেন।
আদালতে শুনানির সময় চিন্ময়ের পক্ষে তার আইনজীবী বলেন, তিনি ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে বন্দি থাকায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। এছাড়া মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকলেও তাকে জামিন না দেওয়ায় মানবিক দিক বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে আদালতে যুক্তি তুলে ধরে। সংশ্লিষ্ট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলরা বলেন, মামলাগুলো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তদন্তের স্বার্থে জামিন দেওয়া হলে তা বিচার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য আদালতে আরও জানান, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট আটটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় তিনি ইতোমধ্যে হাইকোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। তবে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও পরে আপিল বিভাগ সেই জামিন স্থগিত করেন।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে মামলাগুলো শুধু আইনি পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেও তা ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তার অনুসারীরা অভিযোগ করছেন, তাকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত কারণে টার্গেট করা হচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলাগুলো এখন দেশের আলোচিত আইনি ইস্যুগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকায় আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন বিচারাধীন অবস্থায় আটক থাকার বিষয়টিও সামনে আনছেন।
চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় সংঘর্ষের সেই ঘটনার পর থেকে আইনজীবী মহলেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের সহকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে একাধিক কর্মসূচি পালন করেছেন। তারা বলছেন, আদালত চত্বরে সংঘটিত এমন নৃশংস ঘটনা বিচারব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের অনুসারীরা বিভিন্ন সময়ে তার মুক্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়েছেন। তারা বলছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী এগিয়ে চলছে।
এখন আগামী ১৪ মে’র দিকে তাকিয়ে আছে উভয় পক্ষ। ওইদিন হাইকোর্ট চার মামলায় চিন্ময়ের জামিন আবেদন বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। আদালতের সেই সিদ্ধান্ত মামলাগুলোর পরবর্তী আইনি গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত