প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঘাটতি বাজেট নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান উঠেছে দেশের নীতিনির্ধারণী ও অর্থনৈতিক মহলে। সরকারের অতিরিক্ত ঋণনির্ভর ব্যয় ব্যবস্থাকে ‘ধার করে ঘি খাওয়ার নীতি’ বলে অভিহিত করে এ ধারা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ ঘাটতি বাজেট ও ঋণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, সেগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠিন কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বৈষম্য কমিয়ে অর্থনীতিকে সুষমভাবে বিস্তৃত করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুযোগ বৃদ্ধি, কৃষক ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তা অর্জনের জন্য শক্তিশালী নীতি বাস্তবায়ন দরকার বলে তারা মত দেন।
একটি নীতিগত আলোচনায় বলা হয়, দেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে বড় আকারে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও এর জন্য কেবল পরিকল্পনা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়নের নামে বারবার ঘাটতি বাজেট বাড়িয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বরং রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকারকে এখনই ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো ছোট করা, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না।
তিনি আরও বলেন, অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে কার্যকর করতে হবে। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা গেলে অর্থের নতুন উৎস তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগও বিস্তৃত হবে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে অর্থনৈতিক কাঠামো এখনও কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। ব্যাংকিং খাত, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং বড় প্রকল্পগুলোতে সীমিত কিছু গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে, যা প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাদের মতে, অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক করতে হলে এই কাঠামোগত বৈষম্য ভাঙা জরুরি।
তারা বলেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত না হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। পাশাপাশি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে সরাসরি প্রণোদনা ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের এক নেতা বলেন, বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উচ্চ সুদের হার ও সীমিত ঋণ প্রবাহ ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা তৈরি করছে। এর ফলে বড় গোষ্ঠীগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, অর্থনীতির কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে শুধু পরিকল্পনা নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বাজার ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
অর্থনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা দ্বিগুণ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি নয়, বরং উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনীতির এই রূপান্তরকে সফল করতে হলে শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত না হলে যেকোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে ‘ঘি ধার করে খাওয়ার’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান এখন জোরালো হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের মতে, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো।