প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়াম। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেডিয়ামটি প্রতিবছর প্রায় ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এই স্টেডিয়ামেই আগামী ১১ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার। ফুটবল ইতিহাসের বহু স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী এই ভেন্যু—বিশেষ করে দিয়েগো মারাদোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের কারণে স্টেডিয়ামটি বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু এখন সেই গৌরবময় ভেন্যুই প্রকৃতির এক অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।
নাসার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টেডিয়ামের নিচে দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে উপরিভাগ ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে এবং স্টেডিয়ামসহ পুরো এলাকাই নিচের দিকে বসে যাচ্ছে। শুধু স্টেডিয়াম নয়, মেক্সিকো সিটির বৃহৎ অংশও প্রতি মাসে গড়ে প্রায় আধা ইঞ্চি করে দেবে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী মারিন গভোর্চিন বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে মাটির ভেতরের কাঠামোতে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শহরের উপরের ভার বহন করার মতো শক্তি কমে যাওয়ায় ভূমি ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, শক্তিশালী রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাকাশ থেকে এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটি এবারের বিশ্বকাপে পাঁচটি ম্যাচ আয়োজনের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু মাটির নিচে দেবে যাওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মাঠের কাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো বড় ধরনের স্থায়ী সমাধান ঘোষণা করেনি। তবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ ও স্টেডিয়ামের কাঠামো পর্যবেক্ষণ জোরদারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেক্সিকো সিটির এই সমস্যা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে শহরটি ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে। তবে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের আগে এই ধরনের তথ্য সামনে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভেন্যুর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম যদি কাঠামোগত ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে সেটি শুধু খেলার মানই নয়, দর্শকদের নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ফিফা এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা যৌথভাবে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশের যৌথ আয়োজন।
মেক্সিকো সিটির স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই খবর নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, শুধু স্টেডিয়াম নয়, পুরো শহরের ভবিষ্যৎই এখন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে আজতেকা স্টেডিয়ামের মতো ঐতিহাসিক ভেন্যু ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে মেক্সিকো সিটির নগর পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর আগে এমন একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা আয়োজকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনকে নিরাপদ ও সফল করতে পারে।